Saturday, January 21, 2012

ফাইব্রোস্ক্যান : লিভার বিষয়ে সর্বশেষ জ্ঞান।

লিভার আমাদের শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর একটি। তাই এর যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনিয়তা অপরিসীম।লিভারের রোগ সমূহ নির্ণয়ে ফাইব্রোস্ক্যান বিষয়ক লেখার ইচ্ছা অনেক আগে থেকেই ছিলো,আমার দেশে ১ জুন এই বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়,যা সাধারণ ,মানুষের জানার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করি। আপনাদের সাথেও শেয়ার করলাম।

বর্তমানে পৃথিবীতে প্রতি ১২ জনে ১ জন হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। বাংলাদেশও এ হিসাবের বাইরে নয়। আমাদের পরিচালিত গবেষণায় দেখতে পেয়েছি, এদেশে এক কোটিরও বেশি লোক এ দুটি ভাইরাসে আক্রান্ত। এসব ব্যক্তি সময়ের ব্যবধানে লিভারের নানা ধরনের জটিলতায় ভুগে থাকেন। পাশাপাশি মানুষের জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে ফ্যাটি লিভারের মতো রোগও পাশ্চাত্যের মতোই এখন আমাদের ঘরে ঘরে। লিভারের বিভিন্ন রোগ নিরূপণের জন্য আমাদের দেশেই নানা আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে লিভার রোগের চিকিত্সার জন্য লিভার বায়োপসির প্রয়োজন পড়ে। পরীক্ষাটি খুব বেশি জটিল না হলেও, বায়োপসি করার জন্য রোগীকে হাসপাতালে একদিন ভর্তি থাকতে হয়।
উন্নত বিশ্বের অগ্রগতির ধারায় বর্তমানে বাংলাদেশেও লিভার ও অন্যান্য রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য লেটেস্ট সব টেকনোলজি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধারারই সর্বশেষ সংযোজন ‘ফাইব্রোস্ক্যান’। বিশ্ববাজারে এ প্রযুক্তির আবির্ভাব মাত্র কয়েক বছর আগে, আর এখন এটি রয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়—আমাদের রোগীদের সাধ্যের মধ্যেই।
লিভার সিরোসিসের কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি। আমাদের জানা আছে, এর নানা কমপ্লিকেশনের কথাও। উন্নত প্রযুক্তির আবির্ভাব, লিভার চিকিত্সার প্রসার এবং পাশাপাশি হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ ও ফ্যাটি লিভারের মতো রোগগুলো বিস্তার লাভ করায় বাংলাদেশে লিভার সিরোসিস রোগ এখন ধরা পড়ছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। লিভারে সিরোসিস হতে, কারণ বুঝে সাধারণত বেশ কিছুদিন সময় লাগে। এতদিন পর্যন্ত একমাত্র বায়োপসি করলেই লিভার সিরোসিস হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যেত। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের লিভার সিরোসিসের ক্ষেত্রে একথাটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
‘ফাইব্রোস্ক্যান’র কল্যাণে উন্নত বিশ্বের মতো এদেশেও আমরা এখন বায়োপসি না করেই বায়োপসির চেয়ে কম খরচে এবং রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি না করে, মাত্র কয়েক মিনিটে লিভারে সিরোসিস আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারি। লিভারে হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’, ফ্যাটি লিভার বা অন্য যে কোনো কারণে ক্রনিক হেপাটাইটিস হলে লিভার টিস্যু ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে যায়। একে আমরা বলি ফাইব্রোসিস। এই ‘ফাইব্রোসিস’ ধীরে ধীরে একসময় ‘সিরোসিসে’ রূপ নিতে পারে। ফ্রান্সের ঊপযড়ংবহ কোম্পানির উদ্ভাবিত ‘ফাইব্রোস্ক্যান’ যন্ত্রটির সাহায্যে লিভারে ফাইব্রোসিসের বিভিন্ন ধাপ নিরূপণ করা যায়। ফলে আমরা খুব সহজেই বলে দিতে পারি কারও সিরোসিস আছে কিনা কিংবা সিরোসিস না হয়ে থাকলে তা হওয়ার আশঙ্কা ঠিক কতখানি। লিভারের অবস্থা জানার জন্য যে কোনো সুস্থ ব্যক্তিও রুটিন পরীক্ষা হিসেবে ফাইব্রোস্ক্যান করাতে পারেন।
‘ফাইব্রোস্ক্যান’র কয়েকটি বিশেষত্ব হলো—এটি সহজে ও তাড়াতাড়ি করা যায়, কোনো আগাম প্রিপারেশনের দরকার হয় না, হাসপাতালে ভর্তিও থাকতে হয় না, ৫ থেকে ৮ মিনিটেই পরীক্ষাটি করা যায়। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, প্রয়োজনে বার বার করা যায়। লিভারের ফলোআপের জন্যও এটা খুব কার্যকর। বিশেষ করে যারা বায়োপসি করাতে ভয় পান তাদের জন্য উপযোগী এবং লিভারের রুটিন পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি ‘ফাইব্রোস্ক্যান’র মতো আধুনিক পরীক্ষার সুযোগ আজ আমাদের দেশেও আছে। আজকের মানুষ অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন—আর স্বাস্থ্য সচেতন সবার জন্যই ফাইব্রোস্ক্যান, যা লিভার বিষয়ে আমাদের সর্বশেষ জ্ঞান।
লেখক : ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Saturday, June 14, 2008

Woman (স্ত্রী রোগ)

মেয়েদের প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
তাহমিনা হক জয়া
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ।

মেয়েদের স্বাস্থ্য সমস্যার প্রধান একটি সমস্যা প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করার প্রধান জীবাণুটি হলো ব্যাকটেরিয়া। তবে ছত্রাক এবং ভাইরাসও এ ধরনের প্রদাহ ঘটায়। মেয়েদের মূত্রনালী পায়ুপথের খুব কাছে থাকে বলে সহজেই জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। ই-কলাই নামক জীবাণু শতকরা ৭০-৮০ ভাগ প্রস্রাবের প্রদাহের কারণ। অনেক সময় যৌন সঙ্গমের কারণেও জীবাণু মূত্রনালীতে প্রবেশ করে। এসব জীবাণু মূত্রনালীপথে মূত্রথলিতে ও কিডনিতে প্রবেশ করে।

এড়্গেত্রে শুধু প্রস্রাবে জ্বালাপোড়াই করে না, বার বার প্রস্রাবের বেগ হয়, ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব পড়ে। প্রস্রাবের রঙ ধোঁয়াটে, দুর্গন্ধযুক্ত ও পরিমাণে কম হয়। মাঝে মাঝে তলপেটে ব্যথা হতে পারে। যৌনকাজে অনিচ্ছা জাগে। অনেক সময় শরীরে জ্বর আসে। মাঝে মাঝে বমি হতে পারে। নববিবাহিত মেয়েদের মধুচন্দ্রিমা যাপনকালে প্রস্রাবের প্রদাহ হতে পারে। গর্ভবতী মহিলারা প্রস্রাবের প্রদাহে আক্রান্তô হন। চিকিৎসা ড়্গেত্রে প্রচুর পানি খেতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শমতো। এ সময় সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে। গর্ভবতী মহিলাদের ড়্গেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া প্রতিরোধে কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে?

০ প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। পানির পরিমাণ এত বেশি হতে হবে যাতে দৈনিক কমপড়্গে দুই লিটার প্রস্রাব তৈরি হয়। দিনের মধ্যে দুই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যে প্রস্রাব করতে হবে। কখনো প্রস্রাব আটকে রাখা যাবে না।

০ ঘুমোতে যাওয়ার আগে এবং ঘুম থেকে জাগার পর প্রস্রাব করতে হবে।

০ সহবাসের পর পানি দিয়ে ভালোভাবে প্রস্রাবের রাস্তôা ধুয়ে ফেলতে হবে।

০ মলত্যাগের পর শৌচকাজ সতর্কতার সাথে করতে হবে যাতে ঐ পানি প্রস্রাবের রাস্তôায় না আসে। ম ডাঃ মিজানুর রহমান কলেস্নাল

কম ঘুমে মহিলাদের বস্নাড প্রেসার

সারাদিনের খাঁটুনির পর রাতের ঘুম দেয় প্রশান্তিô। দূর করে সব ক্লান্তিô। দেয় পরদিন নতুন উদ্যোমে কাজ করার শক্তি। কিন্তু ঘুমটি হওয়া চাই নির্বিঘ্ন ও অবশ্যই পর্যাপ্ত। ঘুম যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে তা শরীরের ওপর অত্যন্তô নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অপর্যাপ্ত ঘুম নীরবে শরীরের নানা ড়্গতি করে।

সম্প্রতি একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন অপর্যাপ্ত ঘুম কিভাবে মহিলাদের বস্নাড প্রেশার বা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মহিলা দিনে সাত ঘন্টারও কম ঘুমায় তাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

যুক্তরাজ্যের গবেষকরা ১০ হাজারেরও বেশি পুরম্নষ ও মহিলার ওপর পাঁচ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে দেখেন, যেসব মহিলা দিনে ছয় ঘন্টা বা তারও কম ঘুমিয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় বেশি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তô হয়েছে।

যেসব মহিলা রাতে সাত ঘন্টা করে ঘুমিয়েছে তাদের তুলনায় যারা ছয় ঘন্টা করে ঘুমিয়েছে তাদের উচ্চ রক্তচাপে ভোগার সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ বেশি বলে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন।তবে গবেষকরা পুরম্নষদের ড়্গেত্রে কম ঘুমের সাথে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক খুঁজে পাননি। যুক্তরাজ্যের কেভেন্ট্রি’র ওয়ারউইক মেডিকেল স্কুল-এর ডক্টর ফ্রান্সিসকো পিজ্ঝ ক্যাপসিও-এর নেতৃত্বে গবেষকরা ১০ হাজার ৩০০ জনের ওপর দীর্ঘমেয়াদী এ গবেষণা চালান। তখন ঐ ব্যক্তিদের বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৫৫ বছর। গবেষণা শেষে দেখা যায়, ঐ ব্যক্তিদের ২০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তô হয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই সেইসব মহিলা যারা কম ঘুমিয়েছে।

গবেষকরা ধারণা করেছেন, অপর্যাপ্ত ঘুম স্নায়ুতন্ত্রকে অতিমাত্রায় সক্রিয় রাখেযৈা হার্ট ও রক্তনালীসহ শরীরেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উঠতি বয়সী মেয়েদের স্বাস্থ্য
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরি সার্ভিসেস
বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা

মেয়েরা যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন সৌন্দর্যসচেতন হয়ে ওঠে স্বভাবতই। আর স্বাস্থ্যসচেতন হওয়া আরও প্রয়োজন।
তাই গ্রুমিং ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু আলাপচারিতা। যখন খুব ছোট, তখন স্মান করতে পালাই-পালাই ভাব ছিল অনেকের। কিন্তু যখন উঠতি বয়স, বড় হওয়ার সময়, তখন গোসল-বারবার করারই ইচ্ছা হয়।
বোঝা যায় যে স্মান করা আর পরিহার করার বিষয় নয়। হয়তো মনে হয় শরীরে যেসব পরিবর্তন হচ্ছে, সে জন্য নতুন আরও স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা বিধি জরুরি হয়ে পড়ছে। যা হোক, মেয়েরা সে বয়সে নিজের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো দেখে, এতে অনুভব করে, নিজেদের দেখতে একটু অন্য রকম লাগছে, শরীরের বসনও ভিন্ন। বড় হয়ে ওঠার সময় হলো।
ঘামলেই শরীরে দুর্গন্ধ নয়
ব্যায়াম না করলেও শরীর থেকে প্রায় তিন পোয়া পানি বেরিয়ে যায়। তাই শরীর যাতে শীতল থাকে, সে জন্য প্রচুর পানি পান করা দরকার। হয়তো বেশ ঘাম হচ্ছে, গরম পড়েছে, দেহের যে স্বেদগ্রন্থিগুলো রয়েছে, সেগুলো ঝরবেই। বয়ঃসন্ধিকালে স্বেদগ্রন্থিগুলো আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ঘাম হওয়া স্বাভাবিক, স্বাস্থ্যকর ও প্রয়োজনীয় ব্যাপার। শরীরের ভেতর দেহযন্ত্রগুলো কাজ করছে অহর্নিশ, হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছে, পাকস্থলীতে পরিপাক হচ্ছে, মস্তিষ্ক চিন্তা করছে, পেশি সচল হচ্ছে, সেসব কাজের জন্য দেহে তৈরি হচ্ছে তাপ।
দেহতাপ এভাবে উঠে যেতে পারে বিপজ্জনক মানে, আর তাই দেহের তাপ থেকে দেহ মুক্ত না হলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। আর সে জন্যই ঘামের প্রয়োজন।
দেহে যে বাড়তি উত্তাপ তৈরি হচ্ছে, এ থেকে মুক্ত হতে গেলে ঘাম হওয়া প্রয়োজন।
উত্তপ্ত দিনে এ জন্য শরীর থাকে নিরাপদ তাপমাত্রায়, ঘাম হয় বলেই তো। ত্বকের ঘামের বিন্দু দেখা না গেলেও আমাদের ঘাম কিন্তু হচ্ছে, তাপও নির্গত হচ্ছে।
দেহের সর্বত্রই রয়েছে স্বেদগ্রন্থি, তবে বেশি রয়েছে বগলে, পায়ের নিচে ও কুচকিতে। অবশ্য লক্ষ করা গেছে, এসব স্থানে বেশি ঘাম হয়, গন্ধও হয়। এগুলো স্বাভাবিক, এবং নিরাপদেই একে মোকাবিলা করা যায়।

ঘামের গন্ধ হয় কীভাবে
অবাক ব্যাপার হলো, একে ঘামের গন্ধ বলা হলেও এই দুর্গন্ধের জন্য ঘাম কিন্তু দায়ী নয়।
দেহে যেসব ব্যাকটেরিয়া রয়েছে, এগুলো ঘামের সংস্পর্শে এলে এমন দুর্গন্ধ হয়। আর ঘামের চরিত্র ভিন্ন হতে পারে; ব্যায়াম করলে শরীরে যে ঘাম হয় আর নার্ভাস বা ভয় পেলে যে ঘাম হয়, দুটো একই রকম নয়।তাই ব্যায়াম করার পর ঘামে দুর্গন্ধ না পেলেও চাপগ্রস্ত পরিস্থিতির পর ঘামে গন্ধ হতে পারে। বগলের ঘামে এমন কিছু আছে, যাতে এটি ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে জোরে প্রতিক্রিয়া করে, তাই বেশি ঘামে গন্ধ।
যেমন ক্লাসে একগাদা ছেলেমেয়ের সামনে প্রথম দিন বক্তৃতা দেওয়ার পর শিক্ষকের দেহে যে ঘাম হবে, এতে গন্ধ বেশি হওয়া স্বাভাবিক। পায়ে ঘামের গন্ধ বিব্রতকর। কারও কারও এ সমস্যা বেশি হয়।

ঘামের গন্ধ প্রতিরোধ
পায়ে যদি এমন দুর্গন্ধ হয়, তাহলে মোছার ন্যাকড়া বা টাওয়েল দিয়ে প্রতিদিন পা মোছা উচিত। বেবি পাউডার পায়ে দিলে এবং পরিষ্কার মোজা পরলে ঘাম ও দুর্গন্ধ দুটোই কমবে।
যদি মোজা না পরে স্যান্ডেল বা জুতা কেউ পরেন, তাহলে বাতাস চলাচল করে এমন পাদুকা পরা উচিত। পায়ে স্বেদরোধী বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার করতে হবে। গন্ধ শুষে নেয় এমন শুকতলা জুতায় ব্যবহার করা উচিত। এ ছাড়া রাতে জুতা খোলা হাওয়ায় রাখা উচিত।
প্রায় প্রত্যেকের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে শরীরে ঘামের গন্ধ হয়, তবে একে মোকাবিলা করেন অনেকেই সন্তর্পণে। নিজে সজীব ও সতেজ থাকার উপায় প্রতিদিন গোসল করা, যাতে শরীরের ধুলো-ময়লা ধুয়ে যায়। কোমল সাবান আর খুব বেশি পরিমাণে কুসুম গরমপানি ব্যবহার করতে হবে। তবে শুষ্ক ত্বক থাকলে শুষ্কতা বাড়িয়ে দিতে পারে উষ্ণ পানি।

প্রতিদিন পরা উচিত পরিষ্কার মোজা ও অন্তর্বাস। সুতি অন্তর্বাস সবচেয়ে ভালো।
সোয়েটার বা গরম জামা পরতে হলে নিচে পরা উচিত সুতির টিশার্ট। বগলে ঘাম হওয়া স্বাভাবিক, তাই ডিওডরেন্ট বা অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যান্টিপারস্পিরেন্ট বগলে ঘাম হওয়া রোধ করতে পারে। ডিওডরেন্ট তা রোধ করতে পারে না, তবে বগলে গন্ধ আড়াল করে রাখতে পারে।
সূত্রঃ দ্য ন্যাশনাল উইমেন হেলথ ইনফরমেশন সেন্টার

প্রসবোত্তর মায়ের মানসিক সমস্যা
ডা. জিল্লুর কামাল
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।
মোবাঃ ০১৭১১৮১৯৫৩৭, ০১৮১৯২২৬৭০৮

সন্তান প্রসব একজন নারীর জীবনে অতি কাঙ্ক্ষিত ব্যাপার। প্রসবের সাথে সাথে নারী দীর্ঘদিনের গর্ভধারণে পরিবারের সাথে গর্ভকালীন নানা দৈহিক হরমোনাল পরিবর্তনের পরিসমাপ্তি ঘটে। প্রসব করার কাজটিও বেশ পরিশ্রমের। সন্তান প্রসবের পর পর মায়ের দেহে দ্রুত পরিবর্তন ঘটায় তার মধ্যে কিছু শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা দেখা দেয়। এ সময়ের মানসিক অসুস্থতাগুলোকে তিনটি ভাগে বর্ণনা করা যায়।
১. মেটারনিটি ব্লু
২. পারপিউরাল সাইকোসিস
৩. পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন
১. মেটারনিটি ব্লুঃ শতকরা ৫০-৭০ ভাগ মা এ সমস্যায় ভোগেন। প্রসবের তিন-চার দিন পর অসুস্থতা দেখা দেয়। এ সময় মায়ের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। তার মুডে ত্বরিত পরিবর্তন হয়­ এই খুশি, এই দুঃখ; মাঝে মধ্যে অকারণেই কেঁদে ফেলে, সব কিছুতে কেমন ঘোলা ঘোলা ভাব।
এ অবস্থার জন্য তেমন কোনো চিকিৎসার দরকার হয় না। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রসূতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এ অসুস্থতার একটা সামাজিক গুরুত্ব আছে। বিশেষত পুত্রসন্তান চাচ্ছেন এমন মা কন্যাসন্তান প্রসব করলে তার আশপাশের লোকজন এ অসুস্থতাকে ‘পুত্র’সন্তানের জন্য মন খারাপ বলে মনে করেন। এ রকম ভাবনা প্রসূতির পরিচর্যায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
২. পারপিউরাল সাইকোসিসঃ প্রসবোত্তর মানসিক সমস্যার মধ্যে এ রোগটিই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত। প্রতি হাজার প্রসূতির মধ্যে এক থেকে দু’জন এ রোগে আক্রান্ত হন। সাধারণত প্রসবোত্তর প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তায় এ রোগটি দেখা দেয়। এ রোগের প্রধান উপসর্গগুলো­ ঘুম না হওয়া, বিরক্তি, খিটখিটে মেজাজ, খাওয়া-দাওয়া ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীন, আবোল-তাবোল বলা, বাড়ির বাইরে এদিক-ওদিক চলে যেতে চাওয়া, অযথা ভয় পাওয়া, সন্তানটির যত্ন না নেয়া, যেমন- নবজাতক সম্পর্কে ভ্রান্ত বিশ্বাস­ এ সন্তান আসলে একটা শয়তান বা খারাপ কিছু, একে মেরে ফেলাই ভালো।
চিকিৎসাঃ বৈদ্যুতিক চিকিৎসা (ইসিটি) এ রোগের অতি কার্যকর চিকিৎসা। এন্টিসাইকোটিক ওষুধের দ্বারা রোগটির চিকিৎসা করা হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে যায়। কিছু কিছু রোগীর অসুস্থতা দীর্ঘদিন ধরে চলতে পারে।
৩. পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনঃ প্রসবোত্তর বিষণ্নতার প্রকোপ কম নয়, প্রায় শতকরা ১০-১৫ জন প্রসূতি প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় ভোগেন। সাধারণত প্রসবের দুই সপ্তাহ পর এ সমস্যা শুরু হয়। রোগিণী অত্যন্ত ক্লান্তবোধ করেন, অহেতুক দুশ্চিন্তা করেন এবং অযথা ভয়ভীতি পান, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, মন বিষণ্ন থাকে। এ সময় প্রসূতির মনে এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস জন্ম নিতে পারে যে সদ্যজাত সন্তানের কোনো শারীরিক বা মানসিক খুঁত আছে, সন্তানটি তিনি মানুষ করতে পারবেন না, অতএব একে মেরে ফেলাই ভালো। প্রসূতি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন।
চিকিৎসাঃ সাইকোথেরাপি, সামাজিক সচেতনতার উন্নয়ন ও বিষণ্নতাবিরোধী ওষুধ দ্বারা এ রোগের চিকিৎসা করা হয়। প্রয়োজনে বৈদ্যুতিক চিকিৎসা (ইসিটি) ব্যবহার করা যেতে পারে।
কাদের প্রসবোত্তর মানসিক সমস্যা
বেশি হয়ঃ
যেকোনো প্রসূতির প্রসবোত্তর মানসিক সমস্যা হতে পারে। তবে কিছু কিছু বিষয় এ ধরনের মানসিক সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। যেমন­ কম বয়সী মা, আগে যার মানসিক অসুস্থতা হয়েছিল, যার পরিবারের মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস আছে, তা সদ্যজাত সন্তানের যত্নের জন্য মায়ের ওপর যে চাপ থাকে তা লাঘবের পারিবারিক বা সামাজিক ব্যবস্থা না থাকা, মানসিক চাপ, দাম্পত্য অশান্তি ইত্যাদি।
প্রতিরোধঃ
যেসব কারণে সদ্যপ্রসূতির মানসিক সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায় সেসবের প্রতিবিধান করতে পারলে এসব মানসিক রোগ প্রতিরোধ করা অনেকাংশে সম্ভব। এ জন্য দরকার বিশ বছর বয়সের আগে মা না হওয়া, সদ্যপ্রসূতির শারীরিক ও মানসিক বিশ্রামের ব্যবস্থা করা, সদ্যজাত শিশুর যত্নের জন্য পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, দাম্পত্য কলহ মিটিয়ে ফেলা। তার পরও মানসিক সমস্যা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব তার চিকিৎসা নিতে হবে। এতে রোগীর সুস্থতা নিশ্চিত হবে আর মানসিক অসুস্থতার জটিলতাও কম থাকবে।


গর্ভাবস্থায় শরীর ও ত্বকের যত্ন

ডা. সায়লা পারভীন (মিলি)
লেখকঃ স্ত্রীরোগ, প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও সার্জন, যুবক মেডিক্যাল সার্ভিসেস, রোড -২৮, বাড়ি -১৬, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা। মোবাইল -০১৭১১৫৬৩৫১৭

গর্ভাবস্থা একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় অবস্থা। যখন শরীরে অনিবার্য কতগুলো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেমন- ভ্রূণ ধীরে ধীরে বড় হয়, ফলে জরায়ু বড় হতে থাকে। পেট উঁচু হতে থাকে। রক্তের পরিমাণ বাড়ে। কিন্তু হিমোগ্লোবিন কমে। শরীরের ওজন বাড়ে। চর্বিও জমা হয় দেহে। পেটের ত্বকেও স্ট্রেচ পড়ে­ তাই ফাটা ফাটা দাগ হয়। এটাকে বলে স্ট্রিয়া গ্রাভিডেরাম (ঝয়ড়মথ এড়থংমনথড়ৎশ) এই ফাটা কারো কারো কম হয় বা হয় না একেবারেই। আবার কারো খুব বেশি হয়। গর্ভাবস্থায় কেউ কেউ পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক থাকে। কেউ কেউ গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন, যা কখনো কখনো মৃত্যু পর্যন্ত ঘটায়। ঝুঁকিপূর্ণ স্বাস্থ্যসমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করা ও যথাযথ চিকিৎসা নেয়ার জন্য গর্ভবতীকে নিয়মিত স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ দ্বারা মেডিক্যাল চেকআপ করানো উচিত।
প্রথম ভিজিট অর্থাৎ প্রথম তিন মাসে একবার চেকআপ করানো উচিত। তখন রোগীর ওজন, উচ্চতা, ব্লাড প্রেসার চেক করি। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করি। (১) ঐদ% (২) ইলসসন বড়সহমষব থষন জভ য়ীহমষব (৩) ইলসসন --- (৪) টড়মষপ জ/গ/ঊ থষন ধ/দ (৫) ঐইঢ় অঝ (৬) ঠউজখ (৭) ইলসসন ঢ়ৎবথড় ্‌ভসশ থফয়পড় ৭৫বশ বলৎধসঢ়প. (৮) হড়পবষথষধী য়পঢ়য়
যদি সম্ভব হয় তাহলে - (৯) টঝএ-য়স ঢ়পপ হড়পবষথষধী হড়সফমলপ.
রোগীকে কিছু কাউন্সেলিং করা হয়­ গর্ভাবস্থা ও পরবর্তী দুগ্ধদান সম্পর্কে। রোগীর খাবার ও বিশ্রাম সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।
নিয়মিত, পরিমিত, পুষ্টিকর খাবার­ যার পরিমাণ গর্ভাবস্থার আগের থেকে ৩০০ কিলোক্যালরি বেশি হবে। দিনে পাঁচ থেকে ছয়বার খেতে হবে। তিনটি প্রধান খাবার (ভালো খাবার), তিনটি স্ন্যাকস (হালকা) জাতীয় খাবার খেতে হবে।
সকালেঃ রুটি বা ভাত, সবজি, ডাল,
ডিম একটি, দুধ এক গ্লাস
ফল-মৌসুমি ফল- যেকোনো একটি
১১টায়ঃ ফল একটি,
মুড়ি/ চিঁড়া/ বিস্কুট
২টায়ঃ ভাত, ডাল, সবজি, মাছ বা গোশত- দু’টুকরা
বিকেলেঃ চা, বিস্কুট/ মুড়ি/ চিঁড়া
দই বা দুধ ১ গ্লাস
রাতেঃ ভাত/রুটি+সবজি+ডাল+ মাছ বা গোশত
শোয়ার আগেঃ হরলিকস/ দুধ ১ গ্লাস
স্যান্ডউইচ বা ফল
বিশ্রামের ব্যাপারেও তাকে সতর্ক থাকতে হবে। দিনে ২-৩ ঘণ্টা বা কাত হয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। রাতে ৮-১০ ঘণ্টা ঘুমাতে হবে।
যাবতীয় সাংসারিক কাজ, রান্না করা যাবে। তবে ভারী বস্তু তোলা নিষেধ। চাপকল চাপা যাবে না। যাদের একেবারেই কাজ করা হয় না, তারা সকালে বা বিকেলে হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো।
ত্বকের যত্নঃ শীতকালে বেশি ত্বকের যত্ন দরকার হয়। কুসুম গরম পানিতে সাবান দিয়ে গোসল করবেন। গোসলের পর অলিভ অয়েল বা ভালো কোনো লোশন দিয়ে পুরো শরীর ম্যাসাজ করবেন। পেট ত্বক ফাটা রোধ করতে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো আধুনিক ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন। তা ছাড়া দিনে দু-তিনবার অলিভ অয়েল ম্যাসাজ করতে পারেন। তাতে পেটে ফাটা দাগ কম পড়ে। পরিশেষে বলতে চাই, পরিবারে কেউ গর্ভবতী হলে তাকে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে নিয়মিত নিয়ে যাবেন (গাইনোকলোজিস্ট) চেকআপের জন্য। তাকে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত তাকে বিশ্রাম নিতে দিন। তাহলেই একটি সুস্থ মা ও সুস্থ সবল শিশুর জন্মদান সম্ভব। একটি হাবাগোবা, রোগাপটকা, অসুস্থ বা ত্রুটিপূর্ণ শিশু যে কী বোঝা, তা শুধু যার শিশু ওই রকম তিনিই বলতে পারবেন। যেমন সাপে কাটলে বিষের যে কী যন্ত্রণা, তা শুধু যাকে সাপে কেটেছে সে-ই বলতে পারে। তেমনি অসুস্থ রুগ্‌ণ মা বা শিশুর জন্ম দিয়ে যে মা মারা যায়, উপযুক্ত পুষ্টি, ওষুধ ও চিকিৎসার অভাবে, সে-ই শিশু বা তার পরিবার, জানে যে মা হারা পরিবার কত অসহায়; জনম দুঃখী। তাই আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি, যেন গর্ভাবস্থায় সব মাকে আমরা পুষ্টিকর, সুষম, পরিমিত, নিয়মিত, আহার দেবো। তাকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেবো, তাকে প্রয়োজনীয় ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন ও টিকা দেবো। অসুখ-বিসুখে তাকে উপযুক্ত চিকিৎসা দেবো। তাকে সবসময় হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করব, যার ফলে একটি সুস্থ সবল শিশু ও মা দুয়েরই প্রাপ্তি হবে।


প্রজননস্বাস্থ্য সমস্যা
পরামর্শ দিয়েছেন
ডাজ্ঝ রওশন আরা খানম
স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ
সহকারী অধ্যাপক, বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা

সমস্যাঃ আমার বয়স ৩১। আমরা সন্তান নিতে চাইছি, কিন্তু আমার স্ত্রীর কনসিভ হচ্ছে না। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে আমি সিমেন পরীক্ষা করিয়েছি; কিন্তু কোনো শুক্রাণু পাওয়া যায়নি।
আমার স্ত্রীর রিপোর্ট ভালোই এসেছে। আগে একবার আমার স্ত্রী কনসিভ করেছিল, কিন্তু বাচ্চাটা রাখতে পারিনি। আমার হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ আছে। হেপাটাইটিস-বি পজিটিভ হলে কি শুক্রাণু নষ্ট হয়? নাকি অন্য কারণে? পরামর্শ দিয়ে মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি দিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক
পরামর্শঃ আপনার স্ত্রী আগে কনসিভ করেছিলেন; কিন্তু তা কত দিন আগে সেটা জানাননি। যদি এ সময়ে আপনার এমন কোনো অসুখ হয়ে থাকে, যাতে শুক্রাণু তৈরিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় অথবা শুক্রাণু নির্গমনে বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে এ রকম হতে পারে।
তা না হলে শুধু হেপাটাইটিস-বি পজিটিভের কারণে শুক্রাণু নষ্ট হওয়ার কথা নয়। আপনি আবারও পরীক্ষা করিয়ে দেখতে পারেন। অবশ্যই পুরুষ-বন্ধ্যত্ব নিয়ে কাজ করেন এমন কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করে পরামর্শ নিন।


গর্ভপাতের কারণ ও প্রতিকার
গর্ভধারণ করার পর প্রসবকাল পর্যন্তô চলিস্নশ সপ্তাহের পরিক্রমায় জমাট পানি থেকে পূর্ণাঙ্গ শিশুর অবয়ব পর্যন্তô বিভিন্ন আকার-প্রকার ধারণ করে। এর প্রথম চতুর্থ সপ্তাহ থেকে আটাশ সপ্তাহের মধ্যে যদি কোন কারণে গর্ভস্থ সন্তôান নষ্ট হয় তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে মিসক্যারেজ। ২৮ সপ্তাহ থেকে ৩৭ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভস্থ সন্তôানের মৃত্যু হলে তাকে বলা হয় প্রিটার্ম লেবার। তাছাড়া ৩৭ সপ্তাহ থেকে ৪০ সপ্তাহের মধ্যে যদি গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু হয় তখন তা টার্ম লেবার অর্থাৎ এ সময় গর্ভস্থ শিশু পূর্ণ অবয়ব পায়।

মিসক্যারেজ বা গর্ভপাত হয় আর্লি স্টেজে অর্থাৎ পাঁচ মাসের মধ্যে। এ সময় গর্ভস্থ শিশুর তেমন অবয়ব গড়ে ওঠে না। কিন্তু ২৮ সপ্তাহের পরে, যা প্রিটার্ম লেবার বলে পরিচিত। এ সময় মানবিক আকৃতির অনেকটাই হয়ে যায়। কোন কারণে সেই শিশু যদি মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে বাঁচানো প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। কারণ আমাদের দেশে অতোটা উন্নত ধরনের যন্ত্রপাতি আর্থিক সংকটের কারণে আনা সম্ভব হয় না।

মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা শিশু বাইরের শীত-গরম বায়ুদূষণের প্রতিকূল অবস্থা বুঝতে পারে না। ফলে অপরিণত শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়। ঐ শিশুর পাকস্থলি, লিভার, থার্মোরেগুলেটরি সেন্টার এবং ইমিউনিটি ডেভেলাপ করে না।

এছাড়া লাঙ্গসের মধ্যে যে অ্যালভিউলাস মেমব্রেন থাকে, যা দিয়ে অিজেন যাতায়াত করে। একে সাহায্য করে সারফেকটেন্ট নামে এক রকম ক্যামিক্যাল, এর অভাবে অপরিণত শিশুর শ্বাসকষ্ট হয়। তার পরিণতিতে মৃত্যুও হতে পারে।

আমরা যে কোন খাবার খাই না কেনো, তা হজম রেচনের পর শরীর পায় কার্বোহাইড্রেট, শর্করা, প্রোটিন, পানি ও মিনারেল। হজম রেচনের পরিক্রমায় শিশুর অপরিণত পাকস্থলি থাকায় খাবার ভেঙ্গে প্রসেস করতে পারে না। এছাড়া শিশুর লিভার অপরিণত থাকায় সহজেই জন্ডিসে আক্রান্তô হয়। যার পরিণতি হতে পারে মারাত্মক।

আমাদের ব্রেনের মধ্যে থার্মোরেগুলেটরি সেন্টার আছে যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। শরীরের তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট অর্থাৎ স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় থাকে। কিন্তু এসমস্তô শিশুর ড়্গেত্রে থার্মোরেগুলেটরি সেন্টার অপরিণত থাকার কারণে গরম বা ঠান্ডা পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে হিট বা কোল্ড স্ট্রোক হয়। পরিণামে মৃত্যুও হতে পারে।

তাছাড়া ঐসব শিশুর ইমিউনিটি পাওয়ার ডেভেলাপ করে না। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ড়্গমতা গড়ে ওঠে না। ফলে ভাইরাস আক্রান্তô বা সংক্রমিত হয়ে অপরিণত শিশুর মৃত্যুও হতে পারে। আমাদের দেশে এই সমস্তô প্রিমেচিওর বেবি বা অপরিণত শিশুকে বাঁচানো কষ্টসাধ্য।

গর্ভপাত কেনো হয়

গর্ভস্থ শিশু, মা, বাবার বা দুইজনের শারীরিক ত্রম্নটির কারণে গর্ভপাত হয়। মায়ের যদি হাইপ্রেসার, ডায়াবেটি, হঠাৎ কোন কারণে জ্বর হয়। এছাড়া রক্ত ও জরায়ুর সংক্রমণ, রক্তে টোপস্নাজমার সংক্রমণ হলে ও জরায়ুতে টিউমার বা ফাইব্রয়েড থাকলে গর্ভপাত হতে পারে। অনেক সময় বাচ্চা ধরে রাখার ড়্গমতা জরায়ুর থাকে না। ডাক্তারি পরিভাষায় তাকে বলে সারভাইবাল ইনকমপেন্টন্স। জরায়ুর পানি কম থাকলে গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া প্রসবের সময় পেরিয়ে গেলে জরায়ুর পানি কমতে বা ঘন হতে থাকে। এক সময় গর্ভস্থ শিশু দুর্বল হতে হতে মারা যায়। মা ও শিশুর দুইজনের শারীরিক ত্রম্নটি থাকার কারণে শিশু বিকলাঙ্গ, মাথা বড় বা পেটের কোন অংশ ডেভেলাপ করে না। তখন গর্ভপাত ঘটতে পারে।

মিসক্যারেজ বা গর্ভপাতের আরো অনেক কারণ আছে। যেমন, জেনেটিক ডিফেক্ট, ক্রোমজমের অ্যাবনরমালিটি, হরমোনাল ডিফেক্ট ইত্যাদি। হরমোন প্রজেস্টোরন ও এইচসিজি মায়ের জরায়ুকে ইরিটেট করা থেকে শান্তô রাখে। অর্থাৎ ক্রমাগত ধাক্কা থেকে মুক্ত রাখে। ফলে বাচ্চা মাতৃগর্ভে অড়্গত থাকে। কিন্তু এই দুই হরমোনের পরিমাণ বেড়ে গেলে বা কমে গেলে, ইনবেলেন্সড হলে, বাচ্চা বেরিয়ে যেতে পারে।

আবার থাইরয়েড হরমোন কম থাকলেও বাচ্চা বেরিয়ে যেতে পারে। এছাড়া প্রোলাক্টিন নামে আরো এক রকম হরমোন রয়েছে মায়ের শরীরে। এই হরমোন বেশি থাকলেও বাচ্চা বেরিয়ে যেতে পারে।

শরীর বৃত্তীয় ত্রম্নটিজনিত কারণে অর্থাৎ মায়ের জরায়ুতে ত্রম্নটি (যথা সেপ্টেড ইউটেরাস, বাইকরনয়েট ইউটেরাস) থাকলে মাতৃত্ব আসার পর শিশু স্বাভাবিক বেড়ে উঠতে পারে না। এমতাবস্থায় গর্ভপাত হতে পারে। ম্যালেরিয়া বা নিউমোনিয়া জাতীয় সংক্রমণ থেকে গর্ভস্থ সন্তôানের মৃত্যু হতে পারে। জরায়ুতে ক্রনিক ইনফেকশনেও জরায়ুতে বাচ্চা ধরে রাখতে পারে না বা মৃত্যু হতে পারে।

অটোইউমন প্রসেস দুর্বল হলেও গর্ভপাত হতে পারে। বার বার গর্ভপাতের ফলে ইনফেকশন হয়ে বন্ধ্যাত্বও আসতে পারে। এক কথায় মা হতে হলে তিনটি জিনিস দরকার।

১। ইউটেরাসকে শান্তô থাকতে হবে।

২। বাচ্চা থাকার মতো জায়গা ইউটেরাসে থাকতে হবে।

৩। ইউটেরাসের মুখ বন্ধ রাখতে হবে।

আর সহজ কথায় গর্ভপাতের কারণ হলোঅৈস্বাভাবিক ভ্রূণ, খুঁতযুক্ত ডিম্বানু বা শুক্রানু, নিষেকের ফলে পরিপূর্ণ ভ্রূণ গর্ভচ্যুত হয়। ক্রোমজন বা জিন ঘটিত কারণে যদি ভ্রূণ সঠিকভাবে গঠিত না হয় তবে, গর্ভপাত হতে পারে। প্রসূতির ইস্টোজেন, পজেস্টেরন ও থাইরঙ্নি ইত্যাদি হরমোনের অভাব থাকলে গর্ভপাত হতে পারে।

ইনফেকশনঃ

সিফিলিস, টোপস্নাজমোসিস ধরনের সংক্রামক ব্যাধির কারণে বার বার গর্ভপাত ঘটে। টোপস্নাজমিক রোগের জীবাণু টোপস্নাজম নামক এক কোষী পরজীবী প্রাণী যা অধিকাংশ সময় বিড়ালের মলের সঙ্গে বের হয়। এ জীবাণু প্রতিকূল পরিবেশেও ছয়-সাত মাস বেঁচে থাকে। ঐ সময় খাদ্য বা পানীয়ের সাথে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে টোপস্নাজমা রোগের সৃষ্টি হয়। এ রোগে আক্রান্তô প্রসূতিদের বার বার গর্ভপাত হবার সম্ভাবনা থাকে। জন্মাতে পারে অন্ধ বিকলাঙ্গ বা মৃত শিশু। অনেক সময় শিশুদের মাথায় পানি জমতে পারে তাদের বলা হয় হাইড্রোসেফালাস।

জরায়ুর মুখের কার্যহীনতা

গঠিত ভ্রূণ যখন বড় হয় জরায়ু মুখের কাজ ভ্রূণকে ধরে রাখা। কোন কারণে জরায়ুর মুখ বড় হলে বর্ধনশীল ভ্রম্নণ ধরে রাখতে পারে না। ফলে গর্ভপাত হয়। অনেক প্রসূতি ইচ্ছে করে গর্ভনাশ করেন। ফলে ভবিষ্যতে হতে পারে বন্ধ্যাত্ব। বার বার বা প্রথমবার গর্ভনাশ করলে পরবর্তীতে গর্ভধারণ অসুবিধা দেখা দেয়। গর্ভনাশ করানোর ফলে জরায়ুর মুখের কার্যহীনতা বা ইনফেকশনের জন্যও গর্ভপাত হতে পারে। অস্বাভাবিক জরায়ু জন্মগতভাবে অস্বাভাবিক জরায়ু বা প্রজননতন্ত্র সঠিক না হলে গর্ভধারণে অসুবিধা দেখা দেয়। ভ্রূণ জরায়ুতে সঠিকভাবে স্থাপিত না হওয়ায় গর্ভপাত ঘটে।

বিভিন্ন রোগের কারণে গর্ভপাত

অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, নেফ্রাইটিস, উচ্চরক্তচাপ ইত্যাদি কারণে গর্ভপাত হতে পারে। আবার মায়ের শরীরে যদি কোনভাবে সর্বদা ইরিটেট হতে থাকে তাহলেও বাচ্চা বেরিয়ে আসতে পারে।

প্রতিকার

গর্ভপাত থেকে রেহাই বা বন্ধ্যাত্বের সঠিক চিকিৎসা হলো ওষুধ, ইনজেকশন আর অপারেশন। হরমোনাল ওষুধ ও ইনজেকশন দেয়া হয়। জরম্নরি হলে জরায়ুতে সূড়্গ্ন অপারেশন দরকার হয়। এর চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের আওতার মধ্যেই আছে। যেটা প্রথমেই মনে রাখা দরকার তা হলো ৈমাতৃত্বকালীন সময় মাসিকের মতো পানি বা রক্ত বা রক্তিম পানি বের হতে থাকলে, অস্বাভাবিক ব্যথা করলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। তারপর পরীড়্গা-নিরীড়্গা করিয়ে গর্ভনষ্টের সঠিক কারণ জেনে উপযুক্ত চিকিৎসা করালে গর্ভপাত ঠেকানো সম্ভব।

গর্ভসঞ্চারের পর শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশ্রাম দরকার। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কারণে-অকারণে ওষুধ খাওয়া ড়্গতিকর হতে পারে। হরমোনের ঘাটতি থাকলে ওষুধের মাধ্যমে তা পূরণ করা দরকার। ইনফেকশন থাকলে চিকিৎসা করা দরকার।

জন্মগতভাবে জরায়ুতে বা প্রজননতন্ত্রে ত্রম্নটি থাকলে অপারেশনের মাধ্যম ঠিক করে নেয়া দরকার। চিকিৎসা শাস্ত্রে সাড়া জাগানো বৈপস্নবিক পরিবর্তন হলো টেস্ট টিউব বেবি। এই চিকিৎসায় প্রায় শতকরা ত্রিশজনের জীবনে মাতৃত্ব আসে। তবে এই চিকিৎসা এখনো ব্যয়বহুল। যে সমস্তô নারীর বন্ধ্যাত্ব নেই কিন্তু বার বার গর্ভপাত হয়, তার জন্য দরকার মনোবিজ্ঞানসম্মত এক চিকিৎসা। যাকে বলে টেডার লভিং কেয়ার। সংড়্গেপে টিএলসি।

বাচ্চা না হবার ভয় যাদের মনে ভর করে, যারা মনোবল হারিয়ে ফেলে হতাশাগ্রস্তô হন এবং ভঙ্গুর বিশ্বাস তার দেহকে গর্ভপাতের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। এমতাবস্থায় তাকে প্রতিদিন মনোবল জুগিয়ে মা হবার স্বপ্ন দেখান, তার মধ্যে বাচ্চা হবার বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলুন। এ বিশ্বাস তার দেহকে গর্ভপাত প্রবণতা থেকে মুক্ত রাখবে। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে প্রার্থনা। পরম করম্নণাময়ের কাছে উপযুক্ত প্রার্থনাই কাঙিড়্গত মাতৃত্বের হাসি ফোটাবে।

০ ডাঃ নাদিরা বেগম

প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন।

সহকারী অধ্যাপক, জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল, সিলেট।

চেম্বারঃ মেডি এইড, মধুশহীদ মাজারের কাছে।


মেয়েদের স্তনে চাকা বা গোটা

ডা. ওয়ানাইজা

মহিলাদের স্তনে চাকা বা গোটা হওয়া অথবা গোটা ভাব অনুভূত হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। এসব গোটার বেশিরভাগই ক্ষতিকর কিছু নয় অর্থাৎ এগুলো ক্যান্সার নয়। মাসিকের পূর্বে স্তনে কিছু পরিবর্তন হয়। স্তনের টিস্যু নানান হরমোন দ্বারা প্রভাবিত হয়। ফলে স্তনে চাকা অথবা গোটা ভাব বা ব্যথাও অনুভব হতে পারে। নিজেদের স্তনের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো মহিলাদের সবারই জানা প্রয়োজন। তাহলে অস্বাভাবিক কিছু হলে সহজে বোঝা যাবে। মাসিকের আগে সাধারণত স্তনে ব্যথা এবং চাকা ভাব মনে হতে পারে। এ রকম অবস্থায় দুশ্চিন্তা না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই শ্রেয়। ডাক্তার আপনাকে পরীক্ষা করে দেখে প্রয়োজন হলে আরো কিছু পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে পারেন।
সাধারণত যেসব পরীক্ষা করা হয় সেগুলো হলোঃ
মেমোগ্রাম
মেমোগ্রাম স্তনের এক্স-রে। ৩০ বছরের বেশি বয়সে মেমোগ্রাম সবচেয়ে বেশি কার্যকর হয়। কারণ এই বয়সে স্তনের টিস্যু কম গ্লান্ডুলার থাকে এবং এক্স-রের ছবি ভালো আসে।
ফাইন নিডল এসপিরেশন সাইটোলজিঃ একটি সূক্ষ্ম সুঁচ দ্বারা স্তনের গোটা থেকে কিছু কোষ সরিয়ে নিয়ে তা অনুবীক্ষণ যন্ত্র দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষা করতে সাধারণত খুব একটা কষ্ট হয় না।
আলট্রাসাউন্ডঃ শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে এই পরীক্ষা করা হয়। ছোট মাইক্রোফোন জাতীয় যন্ত্র স্তনের উপর ধরা হয়। স্তনের গোটা বা চাকা ভাব এই পরীক্ষায় ধরা পড়ে। সব বয়সের মহিলাদের জন্য এই পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর। এগুলোর সাথে রোগীকে পরীক্ষা করে ডাক্তার নিশ্চিত হন যে স্তনে গোটা বা চাকা ভাব হয়েছে কি না। এই পার্থক্যটা বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফাইব্রোএডেনোমা এবং সিস্ট­ এই দু’টি সবচেয়ে সাধারণ ক্ষতিকর নয় এমন গোটা।
ফাইব্রোএডেনোমাঃ ১৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ফাইব্রোএডেনোমো হয়। স্তনে একটি শক্ত চাকা যা চাপ দিলে বেশ সহজে নড়াচড়া করে। আকৃতিতে বাড়তে অথবা কমতে পারে, সময়ে চাকাটা মিলিয়েও যেতে পারে। পরীক্ষা করে ফাইব্রোএডেনোমা নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে অপারেশন না করলেও চলে। তবে রোগী যদি ৩০ বছরের বেশি বয়সী হন তাহলে ফাইব্রোএডেনোমা নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে অপারেশন করে সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দেয়া হয়। অজ্ঞান করে ছোট অপারেশনের মাধ্যমে গুটিটা সরিয়ে ফেলা হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু একটা ছোট কাটা দাগ থাকে, যা আস্তে আস্তে পরে মিলিয়ে যায়। অনেক সময় স্তনের অন্য জায়গায় ফাইব্রোএডেনোমা নতুন করে আবারো হতে পারে।
সিস্টঃ স্তনের সিস্ট একটি তরল পদার্থে ভরা থলি। হঠাৎ করে সিস্ট হলে ব্যথা হতে পারে। ৩০-৫০ বছর বয়সে সাধারণত এগুলো হয়। সিস্টের চিকিৎসাও খুব সহজ। একটি ছোট সুঁচ দিয়ে চাকা থেকে পানিটা বা তরল পদার্থটা বের করে ফেলা হয়। কোনো জটিলতা না থাকলে চাকাটা সম্পূর্ণরূপে চলে যায়। যে মহিলাদের সিস্ট হয় তাদের পরবর্তীতেও স্তনের বিভিন্ন জায়গায় সিস্ট হতে পারে। অনেক সময় এসব সিস্ট অপারেশন করে সরানো হয়। ওষুধ দ্বারাও কোনো সময় চিকিৎসা করা প্রয়োজন হতে পারে। ফাইব্রোএডেনোমা এবং সিস্ট ক্যান্সার নয় এবং এগুলো হলে ক্যান্সারের সম্ভাবনাকে বাড়ায় না। মহিলাদের নিজেদের স্তন সম্পর্কে সচেতন ও সজাগ থাকতে হবে, যাতে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন। সব স্তনের গুটি পরীক্ষা করা আবশ্যক। ৯০ শতাংশ গুটি ক্ষতিকর নয়। সময়মতো ধরা পড়লে ছোট অপারেশন দ্বারা এর চিকিৎসা হতে পারে এবং তাতে আপনার জীবন রক্ষা পেতে পারে।
চেম্বারঃ যুবক মেডিক্যাল সার্ভিসেস , বাড়িঃ ১৬, রোডঃ ২৮ (পুরাতন), ১৫ (নতুন), ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, ঢাকা।
মোবাইলঃ ০১৯১১৫৬৬৮৪২


জরায়ু টিউমার প্রতিরোধে শাকসবজি

ডা. মনিরুল ইসলাম
অনেক মহিলা জরায়ুর টিউমার ‘ফাইব্রয়েডে’ আক্রান্ত হন। সচরাচর এই টিউমার উপসর্গবিহীন থাকলেও কখনো কখনো এটা তলপেটে ব্যথা, রক্তস্বল্পতা এবং প্রজননগত সমস্যা ঘটাতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মহিলা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেডমিট খান এবং সবুজ শাকসবজি কম খান তারা এ সমস্যায় বেশি আক্রান্ত হন।
এসবের সাথে জরায়ুর টিউমারের সম্পর্ক কী? অতিরিক্ত পরিমাণ উচ্চমাত্রার ইস্ট্রোজেন ফাইব্রয়েড উৎপাদন একটি ভূমিকা পালন করে। আর গবেষণায় দেখা গেছে, পক্ষান্তরে সবজি ও ফলমূলে এক ধরনের উপাদান থাকে যার নাম ‘আইসোফ্লাভোনয়েডস’। এটা শরীর থেকে ইস্ট্রোজেনের প্রভাব কিছুটা কমিয়ে সমতা বিধান করে।
আপনি যদি জরায়ুর টিউমার ‘ফাইব্রয়েড’-এর ঝুঁকি কমাতে চান তাহলে নিচের পরামর্শগুলো
মেনে চলুনঃ ক্স গরুর গোশত কম খাবেন। অন্য রেডমিট যেমন ছাগল ও ভেড়ার গোশতও কম খাবেন। যারা শূকরের মাংস খান তারা সেটা বাদ দেবেন। দৈনিক তিন আউন্সের বেশি রেডমিট খাবেন না।
ক্স বেশি করে ব্রকলি, অ্যাসপারাগাস, স্পিনেক এবং অন্য সবুজ শাকসবজি খাবেন। চেষ্টা করবেন দৈনিক পাঁচ ধরনের সবজি খেতে, আর এই পাঁচ ধরনের মধ্যে একটি বা একাধিক সবজি যেন সবুজ হয়।
স্তন-ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি
ডা· পারভীন শাহিদা আখতার
অধ্যাপক, মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা

স্তন-ক্যান্সার নির্ণয় হওয়ার পরের সময়টা রোগী ও তার পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোগী ও তার পরিবার সহজে এ রোগ মেনে নিতে পারে না। এ ছাড়া রোগী নিজে ক্যান্সার রোগের ভয়ে ও শোকে এতই কাতর হয়ে থাকে যে তার নাওয়া-খাওয়া, ঘুম, স্বাভাবিক কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রোগী মানসিক ও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যায়।
রোগীর প্রিয়জনকে তাই এ সময় কাছে কাছে থাকতে হবে ও সাহস দিতে হবে। রোগীকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। সম্ভব হলে রোগীর সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনা করা উচিত, যাতে চিকিৎসা গ্রহণ করার জন্য রোগী শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারে।
এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারে পরিবারের অভিজ্ঞজন, সমাজকর্মী, নার্স, চিকিৎসক কিংবা ভুক্তভোগী যারা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ জীবন যাপন করছে।
আক্রান্ত রোগী ও তার পরিবারের কয়েকটি তথ্য অবশ্যই জানা উচিতঃ
স্তন-ক্যান্সার একটি নিরাময়যোগ্য রোগ। এ রোগ যেকোনো পর্যায়ে শনাক্ত হলে, কোনো না কোনো চিকিৎসা দেওয়া যায়, জীবনকে দীর্ঘায়িত করা যায় এবং জীবনের মান বাড়ানো যায়।
কোন পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হয়েছে, কী কী চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োজন ও চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার উপশম বা কমানোর উপায়, চিকিৎসার সময়কাল ও খরচ, চিকিৎসা-পরবর্তী যত্ন প্রভৃতি অবশ্যই জানতে হবে।
স্তন-ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। যেমন রোগের পর্যায়, বয়স, শারীরিক অবস্থা, অন্য কোনো অসুখে আক্রান্ত কি না ইত্যাদি। স্তন-ক্যান্সারের প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিগুলো হলো সার্জারি বা শল্যচিকিৎসা, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও হরমোনথেরাপি।

রেডিওথেরাপি কী
রেডিওথেরাপি হচ্ছে আয়ন প্রস্তুতকারী অদৃশ্য শক্তি যেমন এক্স-রে, গামা-রে, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন দিয়ে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা।
গামা-রে বা রশ্মির উৎস কোবাল্ট৬০ টেলিথেরাপি মেশিন এবং এক্স-রে, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন শক্তির উৎস লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন।
কোবাল্ট৬০ ও লিনিয়ার এক্সিলারেটর মেশিন দিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা করা হয়। এতে ঠান্ডা বা গরম কিছুই অনুভূত হয় না। ব্যথাও হয় না। অনেকটা এক্স-রে করানোর মতো।

রেডিওথেরাপি চিকিৎসাপদ্ধতি
রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) রেডিওথেরাপি চিকিৎসার মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ চিকিৎসা আক্রান্ত স্থানে দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে চিকিৎসার আগে সিমুলেটর মেশিনের সাহায্যে চিকিৎসার স্থান নির্ধêারণ করে চিহ্নিত করা হয়।
পরে মার্কার কলম দিয়ে চিকিৎসার স্থানে দাগ দেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ দাগ কোনোভাবেই মোছা যাবে না।
কলমের এ দাগ সাময়িক। তবে তা মুছে গেলেও যাতে চিকিৎসার স্থান সহজেই চেনা যায়, সে জন্য চিকিৎসার সীমানায় টাট্টু (সুই ফুটিয়ে ও কালি দিয়ে যা করা হয়) করা হয়।
স্তন-ক্যান্সার অপারেশনের পর রেডিওথেরাপি চিকিৎসা (অ্যাডজুভেন্ট রেডিওথেরাপি) প্রতিদিন তিন-চারটি ধাপে দেওয়া হয়। প্রতিটি ধাপে চিকিৎসার সময় খুবই কম। মাত্র দুই-এক মিনিট বা তারও কম। তবে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার প্রস্তুতিতে বেশ সময় লেগে যায়। একটি লম্বা সময় নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা দেওয়া হয়। রেডিওথেরাপি চিকিৎসার মাত্রা (ডোজ) ২৫-৩০টি অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়।
সপ্তাহে পাঁচ দিন করে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ চিকিৎসা দিতে হয়। প্রয়োজনে রেডিওথেরাপি ডোজ বাড়িয়ে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়।

মেশিনে রেডিওথেরাপি চিকিৎসা
প্রথম দিন চিকিৎসা দিতে একটু দেরি হয়। কারণ, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট তাঁর দল নিয়ে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার জন্য রোগীকে পরিকল্পনা অনুযায়ী রেডিওথেরাপি মেশিনে সেট করে থাকেন। পরে রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট (রেডিওথেরাপি মেশিন যিনি চালনা করেন) পরামর্শপত্র অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সময় রোগীকে মেশিন রুমে একা থাকতে হয়।
ক্লোজসার্কিট মনিটরে কন্ট্রোল রুম থেকে টেকনোলজিস্ট ও অন্যরা তা পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুম থেকে রোগীর সঙ্গে কথাও বলা যায়। রেডিওথেরাপি চিকিৎসারত রোগীর শরীর থেকে অন্যের শরীরে রেডিওথেরাপি ছড়ায় না। তাই পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে এ চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া যায়। প্রতি সপ্তাহে রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট রোগীকে পরীক্ষা করে থাকেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও অন্যান্য পরীক্ষা করানো হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কম হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অল্প দিনেই তা সেরে যায়।

ক্লান্তি লাগা
রেডিওথেরাপি চিকিৎসায় ক্লান্তি শুরু হয় চিকিৎসার দুই-তিন সপ্তাহ পর থেকে। এ চিকিৎসায় শরীরের ক্ষয়রোধে কিছুটা শক্তি ব্যয় হয়। চিকিৎসাকালে শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে একটু বেশি সময় বিশ্রাম নিলে, পুষ্টিকর খাবার খেলে, রাতে বেশি সময় ঘুমালে ক্লান্তি দূর হয়।

ত্বকের পরিবর্তন
রেডিওথেরাপি চিকিৎসা ত্বকের ওপর দিয়ে দিতে হয়। কখনো কখনো ত্বকে চুলকানো ভাব থাকে। চিকিৎসার তিন-চার সপ্তাহ পর সূর্যতাপে ত্বক পোড়ার মতো লাল হয়ে ওঠে।

রেডিওথেরাপি চিকিৎসার সময় ত্বকের যত্ন
চিকিৎসা-স্থানের আলাদা করে যত্ন নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসা-স্থানে কোনো ধরনের সাবান, লোশন, সুগন্ধি, ট্যালকম পাউডার, কসমেটিকস, ওষুধ বা অন্য কিছু ব্যবহার করা যাবে না। চিকিৎসা-স্থানের ত্বক ঘষামাজা করা যাবে না।
ত্বকে লেগে থাকে এমন কোনো ধরনের টেপ ব্যবহার করা যাবে না।
অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা কোনো কিছুই চিকিৎসার স্থানে ব্যবহার করা যাবে না। এমনকি গরম পানি ত্বকের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। গোসলে স্বাভাবিক অথবা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করা যেতে পারে। গোসলের পর নরম কাপড় বা তোয়ালে দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে পানি শুকাতে হবে।
বগলের নিচে ও সংলগ্ন স্থানে শেভ করার জন্য ইলেকট্রিক শেভার বা রেজর ব্যবহার করা যেতে পারে; অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী। তবে শেভিং লোশন কিংবা হেয়ার রিমুভাল ক্রিম ব্যবহার করা যাবে না।
প্রয়োজন না হলে রোদে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। বাইরে বের হওয়ার সময় শরীর ভালোভাবে ঢেকে নিতে হবে, যাতে চিকিৎসা-স্থান রোদে পুড়তে না পারে। রেডিওথেরাপি চিকিৎসাকালে ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরতে হবে।

অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
রেডিওথেরাপি চিকিৎসাকালে স্তন সামান্য স্কীত হয়ে উঠতে পারে। তাতে অল্প ব্যথা হতে পারে। অনেক সময় উপুড় হয়ে ঘুমাতে অসুবিধা হতে পারে।
তবে চিকিৎসার পর এ সমস্যা সেরে যায়। চিকিৎসা শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পরও (কয়েক মাস থেকে বছর) স্তনে সামান্য ব্যথা হতে পারে এবং আকারে কিছুটা ছোট বা বড় হতে পারে।

Vitamin (ভিটামিন)

ক্যালসিয়াম দেহের জরম্নরি উপাদান

দেহের জন্য ক্যালসিয়াম একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। অন্যান্য খনিজ পদার্থ থেকে দেহে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ বেশী। দেহে শতকরা ৯০-৯৯ ভাগ ক্যালসিয়াম থাকে হাড় ও দাঁতে। ক্যালসিয়াম ফসফরাসের সাথে মিলে এসব কঠিন তন্তুর কাঠিন্য প্রদান করে। ক্যালসিয়ামের বাকি অংশ শরীরের সব কোষের ক্রিয়াকলাপের জন্য গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আজকাল অনেক স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ বা গর্ভবতী মহিলা ক্যালসিয়াম বা ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন। যে কোন মাছের কাঁটা বা নরম হাড় চিবিয়ে রস খাওয়ার মাধ্যমে অতি সহজে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। ক্যালসিয়ামের দৈনিক চাহিদা গর্ভাবস্থায় এবং স্তôন্যদানকারী মায়েদের সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৫০০-২০০০ মিলিগ্রাম, শিশুদের দৈনিক ১০০০-১৪০০ মিলিগ্রাম এবং প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের ৮০০-১০০০ মিলিগ্রাম।

প্রতিদিন আমাদের প্রচুর ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত। ক্যালসিয়ামের প্রধান উৎস হলো দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য। যেমনদৈই, ছানা, পনির, মাখন, ড়্গির ইত্যাদি। এক গস্নাস দুধের মধ্যে ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় ২৯০ মিলিগ্রাম। চর্বিযুক্ত এবং সর উঠানো দুধে ক্যালসিয়াম সামান্য পরিমাণ বেশি থাকে। দুধে অনেক ভিটামিন এবং উৎকৃষ্ট মানের প্রোটিন থাকে, যা ক্যালসিয়ামকে অঙ্গীভূত করতে সাহায্য করে। কোনো যুবক-যুবতী প্রতিদিন তিন গস্নাস দুধ এবং তার সাথে পনির ও দই দিয়ে নাশতা করলে তার প্রোটিনসহ ক্যালসিয়ামের দৈনিক চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব। দুধ ছাড়া ক্যালসিয়ামের অন্যান্য উৎসের মধ্যে কাঁটাসহ ছোট মাছ, ডিমের কুসুম, শিমের বিচি, সবুজ শাক-সবজি, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, কচুশাক, ঢেঁড়শ ইত্যাদিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম আছে।

আমাদের দেহে ক্যালসিয়াম তৈরি হয় না। অবশ্যই খাবারের মাধ্যমে এর চাহিদা পূরণ করতে হয়। ক্যালসিয়ামের অভাবে শিশুদের দাঁত ও হাড়ের সুষ্ঠু গঠন হয় না। যার ফলে শরীরে শক্তি হয় না। ক্যালসিয়াম স্বল্পতায় শিশুদের হাড় ও পায়ের মাংসপেশীতে ব্যথা হয়ে থাকে। ক্যালসিয়ামের অভাব হলে শিশুদের দৈহিক গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং হাঁটা বিলম্ব হয়। ক্যালসিয়ামের সাথে ভিটামিন-ডি-এর অভাব হলে শিশুদের রিকেটস রোগ হয়, যার ফলে শিশু এক সময় পঙ্গুত্বের অভিশাপ বরণ করে। চলিস্নশোর্ধ্ব বয়সে বা রজঃনিবৃত্তির পর মহিলাদের ক্যালসিয়ামের চাহিদা বেড়ে যায়। এ সময় ক্যালসিয়ামের অভাব হলে অস্টিওপোরোসিস বা ‘হাড় ভঙ্গুর’ রোগের প্রবণতা বাড়ে অর্থাৎ অল্প আঘাতে হাড় ভেঙ্গে যায়। এজন্য বয়স্ক মহিলাদের ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া অত্যন্তô জরম্নরী। গর্ভকালীন সময়ে এবং প্রসূতি মায়েদের ড়্গেত্রে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খাওয়া প্রয়োজন। কারণ স্বাভাবিক খাবার দ্বারা অতিরিক্ত ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ নাও হতে পারে। ক্যালসিয়ামের অভাবে গা, হাত-পায়ের জ্বালা-যন্ত্রণা করতে পারে। দেহের বিভিন্ন শিরা-উপশিরা পুরম্ন হয়। এ সময় ক্যালসিয়ামের অভাবে মা ও শিশু দুজনেরই শারীকি সমস্যা হয়। দাঁত ও হাড়ের সুগঠন ছাড়াও ক্যালসিয়ামের আরো কিছু গুরম্নত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, তাহলো হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক স্পন্দন রড়্গা করা, রক্ত জমাট বাঁধায় সাহায্য করা ও হরমোন প্রক্রিয়া এবং মস্তিôষ্ক, চোখ ও কানের প্রক্রিয়ায় ক্যালসিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। মাংসপেশির সঙ্কোচনে ক্যালসিয়ামের গুরম্নত্ব অনেক। কোষ বিভাজন ও রক্ত তৈরিতে ক্যালসিয়াম যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। আমাদের প্রতিদিনের খাবারে লড়্গ্য রাখতে হবে যাতে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার বাদ না পড়ে এবং খাবারের মাধ্যমেই যেন ক্যালসিয়ামের চাহিদা পূরণ হয়।

ভিটামিন-সির তাৎপর্য
ডাঃ মেহবুব আহসান রনি
অনকোলজি বিভাগ
বিজ্ঝএসজ্ঝএমজ্ঝএমজ্ঝইউ।

কেবল শুকনো বীজ ও খাদ্যশস্য ছাড়া প্রায় সব ধরনের খাদ্য-উপাদানে ভিটামিন ‘সি’ থাকে বলে এর অভাব তেমন দেখা যায় না। তবে ক্রমাগত এর অভাব ঘটতে থাকলে শরীরে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকেরা বলেন, ভিটামিন-সির অভাবে শিশুর স্কার্ভি রোগ হয়। বড়দের ক্লান্তি লাগা, দুর্বলতা, নড়বড়ে দাঁত-হাড়, বিভিন্ন গ্রন্থিতে ব্যথা, অল্পতেই রক্তক্ষরণ প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা এবং শরীরে পানি জমে বিভিন্ন রকম জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে।
শরীরে মজুদ হিসেবে থাকার ব্যবস্থা নেই, তাই ভিটামিন ‘সি’ আমাদের প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা দরকার। এটি সরাসরি অন্ত্র থেকে দেহে শোষিত হয় এবং পোর্টাল শিরা দিয়ে রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন কোষে পৌঁছে গুরুত্বপূর্ণ বিপাকীয় কাজে অংশ নেয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ২০ থেকে ৩০ মিলিগ্রাম এবং শিশুদের দৈনিক ১০ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি গ্রহণ করা উচিত। সে জন্য কাঁচা ফলমূল বেশি করে খাওয়া দরকার। প্রতিদিন অন্তত একটি আমলকী যদি খাওয়া যায়, তাহলে ভিটামিন-সির অভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা যাবে। আমলকী ভিটামিন-সির খুবই ভালো একটি উৎস। একটি আমলকী খেলে আপনি পাবেন ৪৬৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি, যা অন্যান্য ফলের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি। তবে কমলালেবু, কাগজি লেবু, আমড়া, জাম্বুরা, কাঁচা তেঁতুল, বরই প্রভৃতিও ভিটামিন-সির ভালো উৎস।
সবজির মধ্যে ফুলকপি, সজিনা, ডাঁটা, বরবটি, মরিচ, করলায় প্রচুর ভিটামিন-সি রয়েছে। আর শাকের মধ্যে মুলাশাক, সজিনাপাতা, শালগমপাতা, আলুশাক প্রভৃতিতে ভিটামিন-সি বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই শরীরে ভিটামিন-সির অভাব পূরণের জন্য নিয়মিত এসব ফলমূল ও শাকসবজি গ্রহণ করে সুস্থ থাকুন।

Stomach (পাকস্থলী)

পেটের যত অসুখ
অধ্যাপক মবিন খান

১৪ কোটি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। যারা শহরে বাস করেন তাদেরও সিংহভাগ ভাসমান অবস্থায় চিলেকোঠায় কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। শরীরের বিভিন্ন রোগ ব্যাধি লেগেই থাকে।

এইসব রোগ ব্যাধির মধ্যে বেশিারভাগ লোক যে রোগটিতে ভুলে থাকেন তা হলো পেটের পীড়া। আপনি ধনী হন কিংবা গরীব হন, কখনও পেটের পীড়া হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে পেটের পীড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলড়্গিত হয়।

পেটের পীড়া বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি আমাশয়, ডায়ারিয়া, পেটের ব্যথা কিংবা হজমের অসুবিধা।

পেটের পীড়া সমূহকে প্রধানতঃ দুভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথমতঃ খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ড়্গুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত্রের রোগ)।

দ্বিতীয়তঃ লিভারের প্রদাহ।

খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ড়্গুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্তô)-এর কারণ জনিত পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

১। স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়া

২। দীর্ঘ মেয়াদী পেটের পীড়া

স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার কারণসমূহঃ

১। আমাশয় ২। রক্ত আমাশয় ৩। ডায়রিয়া

১। আমাশয়ঃ অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ যা ঊজ্ঝ ঐরংঃড়ষুঃরপধ নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিক হয়। এটি মূলতঃ পানিবাহিত রোগ। যারা যেখানে সেখানে খোলা বা বাসী খাবার খেয়ে থাকেন অথবা দূষিত পানি পান করেন তাদের এ রোগ হয়। শহর অঞ্চলে রাস্তôার ধারের খোলা খাবার খেলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে যারা যত্র তত্র মলমূত্র ত্যাগ করেন, কিংবা নদী ও পুকুরের পানি পান করেন তাদের এ রোগে আক্রান্তô হওয়াই স্বাভাবিক।

এ রোগের উপসর্গ হঠাৎ করে দেখা দেয়। যেমন, ঘন ঘন পেটে মোচড় দিয়ে পায়খানা হওয়া, পায়খানার সাতে রক্ত বা আম মিশ্রিত থাকতে পারে, পায়খানায় বসলে উঠতে ইচ্ছে হয় না বা উঠতে পারে না। ড়্গেত্র বিশেষ দিনে ২০/৩০ বার পর্যন্তô পায়খানা হতে পারে।

রক্ত আমাশয়ঃ রক্ত আমাশর প্রধান কারণ হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যার নাম শিগেলা। এই শিগেলা নামক ব্যাকটেরিয়াও দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। রক্ত আমাশয়ের লড়্গণ হলোÌৈপটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, অল্প অল্প করে বার বার পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া এবং মলদ্বারে তীব্র ব্যথা হওয়া।

ডায়রিয়াঃ ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হল খাদ্যে নানা ধরনের পানিবাহিত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।

Ìৈছাট শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণ রোটাভাইরাস নামকম ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে।

অৈার বড়দের ড়্গেত্রে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া দিয়ে যে ডায়রিয়া মহামারী আকারে দেখা যায় তার অন্যতম কারণ হলো কলেরা। আমাদের দেশে শীতকালে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।

পাতলা পায়খানা হলে যদি চাল ধোয়া পানির মতো হয় তবে সেটা কলেরার লড়্গণ। এর সাথে তলপেটে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘন ঘন পায়খানায় যাওয়া এবং শরীর আস্তেô আস্তেô নিস্তেôজ হয়ে যাওয়া এ রোগের মারাত্মক উপসর্গ। এই সময়ে তাৎড়্গণিক ব্যবস্থা নেয়া অতি জরম্নরী। তাছাড়া পেটের পীড়ার অন্যান্য কারণ সমূহের মধ্যে রয়েছে পিত্তথলির প্রদাহ, পাকস্থলীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদান এবং অন্ত্রের প্রদাহ।

দৈীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়ার মধ্যে রয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়। এই দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ

১। ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম

২। খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়া

৩। বৃহদান্ত্রের প্রদানজনিত পেটের পীড়া

এই অসুখগুলো মূলতঃ ড়্গুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের রোগ।

ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (ওইঝ)ঃ অল্প বয়স্ক বা উঠতি বয়স্ক যারা বিশ্ববিদ্যালয় পড় য়া ছাত্র-ছাত্রী, কিংবা যারা নবীন চাকুরীজীবী তাদের মধ্যে ওইঝ রোগটি বেশি দেখা যায়। এই রোগের লড়্গণ হলো পেটে মোচড় দিয়ে ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, যা সকালে নাস্তôার আগে ও পরে লড়্গণীয়। ওইঝ হলে অনেকের পায়খানা নরম বা অনেকের পায়খানা কঠিন হয়।

কঠিন বা নরম যাই হোক না কেন রোগীর পায়খানার সাথে বাতাস যায় এবং পেটে অস্বস্তিô ভাব কাজ করে। অনেকে বলেন, দুধ, পোলাও কোরমা, বিরিয়ানী খেলে এটি বেশি হয়। পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ এই ওইঝ যাদের হয় তাদের স্বাস্থ্যহানী হওয়ার সম্ভাবনা কম।

খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়াঃ পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল গধষধনংড়ৎঢ়ঃরড়হ ঝুহফৎড়সব। ড়্গুদ্রান্ত্র এবং অগ্নাশয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ থাকলে এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রচুর পরিমাণে দুর্গন্ধযুক্ত, সাদা পায়খানা বের হওয়া, পায়খানার সাথে হজম না হওয়া খাদ্য কনার মিশ্রন এবং নির্গত মল পানির উপরে ভাসতে থাকা এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। এর সাথে পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, পেট ফুলে পাওয়া কিংবা ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমে যাওয়া এ রোগের লড়্গণ।

বৃহদান্ত্রের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি। অবশ্য আমাদের দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কম, উন্নত বিশ্বে এই রোগ বেশি হয়। এ রোগের লড়্গণ হলো আম ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা হওয়া, জ্বর কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হওয়া এবং শরীর আস্তেô আস্তেô ভেঙ্গে যাওয়া।

সব বয়সের মানুষের এ রোগ হয়। ঈড়ষড়হড়ংপড়ঢ়ু নামক পরীড়্গার মাধ্যমে এ রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং বিশেষ চিকিৎসা পেলে এ রোগ ভাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এছাড়া পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ এবং পাকস্থলির ও ড়্গুদ্রান্ত্রের প্রদাহের কারণে পেটের পীড়া হতে পারে। এবার সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাকঃ

পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালীর প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালির প্রদাহের ফলে যাদের পেটের পীড়া হয়, তাদের তীব্র পেট ব্যথা হতে পারে। কয়েকদিন পর পর ব্যথা উঠে এবং কয়েকদিন পর্যন্তô তা থাকে। ব্যথার সাথে বমি ও জ্বর হতে পারে। ব্যথাটা পেটের ডানপাশে উপরিভাগে অনুভূত হয়। ব্যথা তীব্র হলে রোগী কষ্টে কাতরাতে থাকেন।

অগ্নাশয়ের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ ুপেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল অগ্নাশয়ের প্রদাহ বা চধহপৎবধঃরঃরং অগ্নাশয় একটি লম্বা অঙ্গ বা ঙৎমধহ যা পেটের ভিতরে পেছনে অবস্থিত। এই অগ্নাশয়ের কাজের উপর নির্ভর করে হজমের ড়্গমতা এবং রক্তে গস্নুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখা। স্বল্পমেয়াদী অগ্নাশয়ের প্রদাহ হলে তাকে অপঁঃব চধহপৎবধঃরঃরং বলে, যার অন্যতম কারণঃ

১। ভূরিভোজ করা।

২। পিত্তনালী বা পিত্তথলিতে পাথর এবং

৩। অ্যালকোহল পানে আসক্তি

বেশিরভাগ ড়্গেত্রে মৃদু বা সহনীয় ব্যথা ভাল হয়ে যায়। তবে অনেক ড়্গেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব কিংবা অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।

পাকস্থলি ও ড়্গুদ্রান্ত্রের প্রদাহঃ উপরের পেটে দীর্ঘদিন বার বার ব্যথা হওয়া, চবঢ়ঃরপ টষপবৎ রোগের লড়্গণ যা পাকস্থলি (ঝঃড়সধপয বা ড়্গুদ্রান্ত্রের ( উঁড়ফবহঁস) এর প্রদাহের কারণে হয়। এই প্রদাহ দুরারোগ্য ব্যাধি। যাদের হয়, বার বার হয়। রোগীও সারে না, রোগও ছাড়ে না।

এই রোগকে পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে বলা যায়। কেননা আমাদের দেশে ১২% লোক চবঢ়ঃরপ টষপবৎ -এ ভুগছেন। এছাড়া যারা অনিয়মিত খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন তাদের এ রোগ বেশি হয়।

লড়্গণের মধ্যে রয়েছে, খালি পেটে ব্যথা, শেষরাতে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা। এ রোগ সেরেও সেরে উঠে না। এবারের শেষটায় এসে যে কথা বলতে চাইখৈাবারের প্রতি অনীহা, অরম্নচি, অস্বস্তিô, ওজন কমে যাওয়া ৈএসব কিছুরই অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ। এ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ এমন আকার ধারণ করে যা কিনা দীর্ঘস্থায়ী জটিল লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।

পেটের পীড়ার চিকিৎসাঃ স্বৈল্পমেয়াদী পেটের পীড়ায় আক্রান্তô রোগীর শরীর খুব তাড়াতাড়ি পানি শূন্য হয়ে যায়। তাই এ অবস্থা প্রতিরোধের জন্য রোগীরকে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পর খাবার স্যালাইন খাওয়ানো বাঞ্ছনীয়।

Ìৈরাগীর শরীরে জ্বর থাকলে এবং পেটে ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে রোগীকে প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক প্রদান করতে হবে।

xৈশশুদের ড়্গেত্রে যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে পেটের পীড়া বেশি হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে কোনো প্রকার ওষুধ না খাওয়ানোই শ্রেয়। তবে শিশুর শরীর যাতে পানি শূন্য না হয়, সেজন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানা হলে শিশুকে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে তার সকল প্রকার খাদ্য প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। যদি শিশু মায়ের দুধ পান করে থাকে, তবে কোনো অবস্থাতেই তা বন্ধ করা যাবে না।

দৈীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়া যেহেতু পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ, পাকস্থলির ও ড়্গুদ্রান্ত্রের প্রদাহ, বৃহদান্ত্রের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহের কারণে হয় তাই এ সমস্তô ড়্গেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়। অনেকে কবিরাজি, গাছ-গাছড়া বা ঝাড় ফুকের মাধ্যমে এ জাতীয় পেটের পীড়া থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর ভেগান্তিôই কেবল বাড়ে এবং রোগও জটিল রূপ ধারণ করে।

পেটের পীড়া প্রতিরোধে করণীয়ঃ

১। পেটের পীড়ায় আক্রান্তô হলে ভীত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

২। খাদ্র গ্রহণের পূর্বে এবং মলত্যাগের পর নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। যে সমস্তô অভিভাবক শিশুকে খওয়ান, তারা শিশুকে খাবার প্রদানের পূর্বে এবং শিশুর মলত্যাগের পর একই নিয়মে হাত পরিষ্কার করবেন।

৩। পরিষ্কার পানিতে আহারের বাসনপত্র, গৃহস্থালী ও রান্নার জিনিস এবং কাপড়-চোপড় ধোয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সাবান ব্যবহার করতে হবে।

৪। পায়খানার জন্যে সর্বদা স্যানেটারী ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে। ৫। রান্নাঘর ও বাথরম্নমের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে।

৬। যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের যেখানে সেখানে বা পুকুর নদীর ধারে মলত্যাগের অভ্যাস পরিহার করতে হবে।

৭। খালি পায়ে বাথরম্নমে বা মলত্যাগ করতে না গিয়ে সর্বদা স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

৮। খাবারের জন্য ফুটানো পানি ব্যবহার করতে হবে এবং পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।

৯। আহারের জন্য তৈরিকৃত খাদ্য সামগ্রী এবং পান করার জন্য নির্ধারিত পানি সর্বদা ঢেকে রাখতে হবে।

১০। পুরোনো, বাসী বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার কখনোই খাওয়া যাবে না।

মনে রাখবেন, পেটের পীড়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পন্থা। আপনি আপনার খাদ্যাভাস, পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলে পেটের পীড়া থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

লেখকঃ চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

কোষ্ঠ্যকাঠিন্যঃ
অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক
বৃহদন্ত ও পায়ুপথ সাজারি বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। চেম্বারঃ জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫ সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। মোবাইলঃ ০১৭২৬৭০৩১১৬

হেদায়েত সাহেবের বয়স চল্লিশের মতো, ভালো চাকরি করেন। হঠাৎ করে বেশ কিছু দিন যাবৎ তার শক্ত পায়খানা হচ্ছে, পায়খানায় দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরও মনে হচ্ছে পায়খানা ঠিক ক্লিয়ার হচ্ছে না, তাকে খুবই বিষণ্ন মনে হচ্ছে। দিন দিন কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছেন, পায়খানার সাথে রক্ত যায় কি না তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন­ খেয়াল করিনি স্যার। তারপর তাকে পরীক্ষা করলাম, প্রোক্টোস্কোপি ও সিগময়ডোস্কোপি টেস্ট করলাম, তারপর দেখতে পেলাম তার কোলনে অর্থাৎ অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার।
হেদায়েত সাহেব যে উপসর্গগুলো নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন তা মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যের। কিন্তু এ কোষ্ঠকাঠিন্য কী, কেন হয়? তা আমরা কিভাবে প্রতিরোধ করতে পারি এবং সময়মতো এর চিকিৎসা না করলে কী কী পরিণতি হতে পারে সে বিষয়েই এখন আমরা আলোচনা করব।
কেউ যদি প্রতি সপ্তাহে তিনবারের কম পায়খানায় যায়, পর্যাপ্ত পরিমাণ আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করার পরও, তখনই একে বলব কোষ্ঠকাঠিন্য।

কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণঃ আঁশজাতীয় খাবার এবং শাকসবজি ও ফলমূল কম খেলে
জ্ঝ পানি কম খেলে
জ্ঝ দুশ্চিন্তা করলে
জ্ঝ কায়িক পরিশ্রম, হাঁটা-চলা কিংবা ব্যায়াম একেবারেই না করলে
জ্ঝ অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার হলে
জ্ঝ ডায়াবেটিস হলে
জ্ঝ মস্তিষ্কে টিউমার হলে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে
জ্ঝ অনেক দিন বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে বিছানায় শুয়ে থাকলে
জ্ঝ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন, যেমন­
ক. ব্যথার ওষুধ
খ. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ
গ. গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ
ঘ. খিঁচুনির ওষুধ এবং
ঙ. যেসব ওষুধের মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকে। তাছাড়া স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার জন্যও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর মধ্যে কাঁপুনিজনিত অসুখ, স্নায়ু রজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত হলে, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও থাইরয়েডের সমস্যা উল্লেখযোগ্য।
কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণঃ
জ্ঝ শক্ত পায়খানা হওয়া
জ্ঝ পায়খানা করতে অধিক সময় লাগা
জ্ঝ পায়খানা করতে অধিক চাপের দরকার হওয়া
জ্ঝ অধিক সময় ধরে পায়খানা করার পরও পূর্ণতা না আসা
জ্ঝ মলদ্বারের আশপাশে ও তলপেটে ব্যথা অনুভব করা এবং
জ্ঝ আঙুল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে পায়খানা বের করা

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়
জ্ঝ কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে
জ্ঝ বেশি করে পানি খেতে হবে
জ্ঝ দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে
জ্ঝ যারা সারাদিন বসে বসে কাজ করেন তাদের নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে এবং
জ্ঝ যেসব রোগের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তার চিকিৎসা করতে হবে।

কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসা না করা হলে যে সমস্যা হতে পারেঃ পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে
জ্ঝ পাইলস
জ্ঝ এনাল ফিশার
জ্ঝ রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্বার বাইরে বের হয়ে যেতে পারে
জ্ঝ মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে
জ্ঝ প্রস্রাব বন্ধ হতে পারে
জ্ঝ প্যাঁচ লেগে পেট ফুলে যেতে পারে
জ্ঝ খাদ্যনালীতে আলসার বা ছিদ্র হয়ে যেতে পারে এবং
জ্ঝ কোষ্ঠকাঠিন্য যদি কোলন ক্যান্সার এবং মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা করা না হয় তবে অকাল মৃত্যুও হতে পারে।

কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য অনেকে প্রতিনিয়ত পায়খানা নরম করার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, সিরাপ এবং মলদ্বারের ভেতরে দেয়ার ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন, যা মোটেও উচিত নয়। প্রতিনিয়ত পায়খানা নরম করার ওষুধ ব্যবহার করলে সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় ফলে মলদ্বারে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা আর থাকে না। তাই বয়স্ক এবং যারা পরিশ্রমের কাজ করেন না, তাদের মধ্যে যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তাদের উচিত কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ নির্ণয় করে সে হিসেবে চিকিৎসা নেয়া। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য ইসুবগুলের ভুসি পানিতে ভিজিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেললে এবং গরু, খাসি ও অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবার যেগুলো মল শক্ত করে তা থেকে দূরে থাকলে অনেকে উপকৃত হতে পারেন।

পিত্তপাথর
ডাজ্ঝ এস এম আবু জাফর
সহযোগী অধ্যাপক, বারডেম হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট

পিত্তথলিতে পাথর খুব সহজেই আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায়। উন্নত বিশ্বে ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ২০ জনেরই পিত্তপাথর হয়। সবার আবার পাথর হলেই ব্যথা-বেদনা হয় না। ৮০ শতাংশ পাথরের রোগীর কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এরা চুপচাপ থাকে; এদের লক্ষণবিহীন নীরব পাথর বলা হয়।
পিত্তথলির অবস্থান ও এর কাজ কী?
পিত্তথলি ওপর-পেটের ডান দিকে লিভারের নিচে থাকে। পিত্তথলি লিভার থেকে তৈরি পিত্ত জমা রাখে এবং চর্বিজাতীয় খাবার খেলে চর্বি হজমের জন্য ক্ষুদ্রান্ত্রে পাঠিয়ে দেয়।
পিত্তথলি না থাকলে চর্বি কীভাবে হজম হবে?
পিত্তথলি শুধু পিত্তরসকে কিছু সময়ের জন্য ধরে রাখে। পিত্তথলি পিত্তরস তৈরি করে না। পিত্তরস তৈরি হয় লিভারে। পিত্তথলি না থাকলে মানুষের কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ এ ক্ষেত্রে লিভার থেকে পিত্তরস সরাসরি পিত্তনালির মাধ্যমে ক্ষুদ্রান্ত্রে প্রবেশ করে।

পিত্তথলিতে কীভাবে পাথর হয়?
জ্ঝ পিত্ত একটি তরল পদার্থ, যার মধ্যে কিছু কঠিন পদার্থ থাকে। তরলের পরিমাণ কমে গেলে অথবা কঠিন পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে পাথর হয়।
জ্ঝ অন্য কোনো অসুখ থাকলে পিত্তে পাথর হতে পারে। যেমন-সিকল সেল অ্যানিমিয়া এবং অপারেশনের মাধ্যমে ক্ষুদ্রান্ত্রের কিছু অংশ কেটে ফেলা হলে। কোনো কারণে পিত্তথলি যদি তার সংকোচন এবং প্রসারণের ক্ষমতা হারায়, তাহলে পাথর হতে পারে।
জ্ঝ পিত্তথলিতে কাদের পাথর বেশি হতে পারে?
জ্ঝ যারা বেশি চর্বিজাতীয় খাবার খায়।
জ্ঝ ডায়াবেটিসের রোগী।
জ্ঝ লিভারের অসুখের রোগী।
জ্ঝ বারবার গর্ভবতী হলে পাথর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

কী লক্ষণ হবে পাথর হলে?
জ্ঝ শতাংশ রোগীর কোনো লক্ষণ থাকে না।
জ্ঝ চর্বিজাতীয় খাবার খেলে খারাপ লাগা।
জ্ঝ পেটে ব্যথা।
জ্ঝ জন্ডিস (অন্য অনেক কারণেও জন্ডিস হয়)।

পাথর থাকলে কী অসুবিধা হতে পারে?
জ্ঝ পাথর সারা জীবনে কোনো কষ্ট না দিতে পারে।
জ্ঝ পিত্তথলির প্রদাহ হয়ে পেটে ব্যথা হতে পারে।
জ্ঝ পিত্তনালিতে সরে গিয়ে জন্ডিস বা প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে।
জ্ঝ বহুদিন থাকার ফলে পিত্তথলির ক্যান্সার হতে পারে।

কীভাবে চিকিৎসা করাবেন?
জ্ঝ ওষুধ দিয়ে গলিয়ে ফেলাঃ এখন পর্যন্ত কোনো ভালো ওষুধ বের হয়নি।
জ্ঝ পাথর ভেঙে ফেলাঃ এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা এখনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কারণ পাথর ভেঙে ফেললেও কিছু থেকে যায় এবং আবার পাথর হতে পারে।

অপারেশনঃ
প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে এর চিকিৎসা সব থেকে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। কারণ এ পদ্ধতিতে পুরো পিত্তথলি পাথরসহ অপসারণ করা সম্ভব। রোগী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পুরা সুস্থ হয়ে ওঠে। পিত্তথলির পাথরের জন্য পেটে ব্যথা হলে এক থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে সার্জনের সঙ্গে দেখা করা উচিত। কারণ এ সময় ল্যাপারোস্কপির সাহায্যে এর চিকিৎসা করা সম্ভব।
জ্ঝ পিত্তনালির পাথর সাধারণত পিত্তথলি থেকে আসে এবং পাথর পিত্তনালিতে এলে এগুলো খুব বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে, যেমন কাঁপিয়ে জ্বর আসা। জন্ডিস ও প্যানক্রিয়াটাইটিস পিত্তনালির পাথরও অপারেশন ছাড়া এর মাধ্যমে অপসারণ করা সম্ভব।
জ্ঝ পিত্তপাথর না হওয়ার জন্য কী সাবধানতা অবলম্বন করবেন?
জ্ঝ উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের ওজন সঠিক রাখতে হবে। ওজন বেশি হলে পিত্তপাথর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
জ্ঝ খাবারের তালিকায় কোলেস্টেরল-জাতীয় খাবার যেমন-মগজ, চিংড়ি মাছ, চর্বি, ঘিজাতীয় খাবার না রাখাই ভালো। তবে এসব খাবার খেতে সম্পূর্ণ নিষেধ নেই, মাঝেমধ্যে খাওয়া যাবে।
জ্ঝ সারা দিনে যে খাবার খাবেন তাকে ভাগ করে চার থেকে ছয়বারে সেটা খাওয়া, বেশিবার খেতে বলার মানে বেশি খাওয়া নয়। কিন্তু বেশিবার খেলে পিত্তথলি বেশিবার সংকুচিত এবং প্রসারিত হবে। ফলে হয়তো পাথর হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
জ্ঝ আঁশযুক্ত খাবার খাবেন, যেমন- শাকসবজি ও ফল। এসব খাবার খেলে পাথর হওয়ার প্রবণতা কম থাকে।

ল্যাপারোস্কপি ও ওপেন অপারেশনের মধ্যে পার্থক্য
ল্যাপারোস্কপির অর্থ হচ্ছে পেটের মধ্যে ক্যামেরা দিয়ে দেখা। ল্যাপারোস্কপি ও ওপেন অপারেশনের উদ্দেশ্য একই অর্থাৎ দুই অপারেশনেই সম্পূর্ণ পিত্তথলি পাথরসহ অপসারণ করা হয়। ল্যাপারোস্কপিতে ছোট ছোট ছিদ্র করে লম্বা সরু যন্ত্র দিয়ে কাজ করা হয়। ফলে অপারেশনের পর ব্যথা-বেদনা কম হয়। ওপেন অপারেশনে পেটকে বড় করে কাটা হয়। এতে অপারেশনের পর ব্যথা-বেদনা বেশি হয়, পেটে বড় দাগ থাকে। ল্যাপারোস্কপির পর পাথর থেকে যায়, এ কথা ঠিক নয়। কারণ এখানে পুরো পিত্তথলিকে বের করা হয়, যেমনটি ওপেন অপারেশনে করা হয়। পাথর থাকলে সেটা পিত্তনালিতে থেকে যেতে পারে, যেটা কিনা ওপেন অপারেশনের ক্ষেত্রেও হতে পারে। পিত্তনালির পাথরের চিকিৎসা ভিন্নভাবে করা হয়। ইআরসিপি-এর মাধ্যমে পিত্তনালির পাথর বের করা সম্ভব। ইআরসিপি-তে সম্ভব না হলে অপারেশন করতে হয়। অবশ্য বেশির ভাগ পিত্তনালির পাথর এখন ইআরসিপি-এর মাধ্যমেই অপসারণ করা যাচ্ছে।

রোগীর জন্য কিছু বিশেষ পরামর্শ
পেটে ব্যথা হলে এবং পিত্তথলির পাথর নির্ণয় হলে এক থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে চিকিৎসা করিয়ে নেবেন, দেরি হলে চিকিৎসাজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি হয়। পিত্তথলির অপারেশন শুধু অভিজ্ঞ সার্জন দিয়ে করাবেন, অনভিজ্ঞ সার্জন দিয়ে অপারেশন করালে অপারেশনজনিত কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে।
অন্যান্য ওষুধ ব্যবহার করলে পিত্তপাথর গলে না। তাই কোনো ধরনের ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট না করাই ভালো। সবাই সুস্থ থাকুন।


পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগ

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

পেপটিক আলসার বা গ্যাস্ট্রিক আলসার রোগের গ্যাস্টিক বা আলসার নামটির সাথে পরিচিত নন এমন লোক খুঁজে বের করা হয়তো খুব কঠিন হবে। সাধারণত লোকজন গ্যাস্টিক বা আলসার বলতে যা বুঝে থাকেন আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলি পেপটিক আলসার।
পেপটিক আলসার যে শুধু পাকস্থলীতেই হয়ে থাকে তা কিন্তু নয়; এটি পৌষ্টিকতন্ত্রের যেকোনো অংশেই হতে পারে। সাধারণত পৌষ্টিকতন্ত্রের যে যে অংশে পেপটিক আলসার দেখা যায় সেগুলো হচ্ছে­
১। অন্ননালীর নিচের প্রান্ত;
২। পাকস্থলী;
৩। ডিওডেনামের বা ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ এবং
৪। পৌষ্টিকতন্ত্রের অপারেশনের পর যে অংশে জোড়া লাগানো হয় সে অংশে।
পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশ তথা আমাদের এ উপমহাদেশে এ রোগীর সংখ্যা খুবই বেশি। ধনীদের চেয়ে গরিব লোকদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। তবে নারী-পুরুষ প্রায় সমানভাবে এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
যেসব কারণে পেপটিক আলসার হতে পারে­
বংশগতঃ কারো নিকটতম আত্মীয়স্বজন, যেমন­ মা, বাবা, চাচা, মামা, খালা, ফুফু যদি এ রোগে ভুগে থাকেন তবে তাদের পেপটিক আলসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যাদের রক্তের গ্রুপ ‘ও’ তাদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি।
রোগ-জীবাণুঃ হেলিকো বেক্টারে পাইলোরি নামক একপ্রকার অনুজীব এ রোগের জন্য বহুলাংশে দায়ী।
ওষুধঃ যেসব ওষুধ সেবনে পেপটিক আলসার হতে পারে তার মধ্যে ব্যথানাশক ওষুধ বা ঘ ঝধরফং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ধূমপানঃ ধূমপায়ীদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি।
এ ছাড়াও কারো পৌষ্টিকতন্ত্র থেকে যদি বেশি পরমাণে অ্যাসিড ও প্রোটিন পরিপাককারী একধরনের এনজাইম বা পেপসিন নামে পরিচিত তা নিঃসৃত হতে থাকে এবং জন্মগতভাবেই পৌষ্টিকতন্ত্রের গঠনতন্ত্রের গঠনগত কাঠামো দুর্বল থাকে তাহলেও পেপটিক আলসার হতে পারে।
তবে সাধারণত যে কথাটা প্রচলিত ভাজা-পোড়া কিংবা ঝালজাতীয় খাবার খেলে পেপটিক আলসার হয় এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে মেলেনি। তবে যারা নিয়মিত আহার গ্রহণ করেন না কিংবা দীর্ঘ সময় উপোস থাকেন, তাদের মধ্যে পেপটিক আলসার দেখা দিতে পারে।
উপসর্গগুলো
পেটব্যথাঃ সাধারণত পেটের উপরিভাগের মাঝখানে বক্ষ পিঞ্জরের ঠিক নিচে পেপটিক আলসারের ব্যথা অনুভব হয়। তবে কখনো কখনো ব্যথাটা পেছনের দিকেও যেতে পারে।
ক্ষুধার্ত থাকলে ব্যথাঃ এ জাতীয় রোগী ক্ষুধার্ত হলেই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে এবং খাবার খেলে সাথে সাথে ব্যথা কমে যায়।
রাতে ব্যথাঃ অনেক সময় রাতের বেলা পেটে ব্যথার কারণে রোগী ঘুম থেকে জেগে ওঠে। কিছু খেলে ব্যথা কমে যায় এবং রোগী আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
মাঝে মধ্যে ব্যথাঃ পেপটিক আলসারের ব্যথা সাধারণত সবসময় থাকে না। একাধারে ব্যথাটা কয়েক সপ্তাহ চলতে থাকে। তারপর রোগী সম্পূর্ণরূপে ভালো হয়ে যায়, এ অবস্থা কয়েক মাস থাকে তারপর আবার কয়েক সপ্তাহ ধরে ঠিক আগের মতো ব্যথা অনুভব হয় ।
ব্যথা কমেঃ পেপটিক আলসার ব্যথা সাধারণ দুধ, অ্যান্টাসিড, খাবার খেলে কিংবা বমি করলে অথবা ঢেঁকুর তুললে ব্যথা কমে।
এ ছাড়াও পেপটিক আলসারের মধ্যে বুক জ্বালা, অরুচি, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, কিংবা হঠাৎ রক্ত বমি অথবা পেটে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হতে পারে।
চিকিৎসা
শৃঙ্খলাঃ পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীদের অবশ্যই ধূমপান বন্ধ করতে হবে। ব্যথানাশক ওষুধ অর্থাৎ এসপ্রিন জাতীয় ওষুধ সেবন থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে হবে এবং নিয়মিত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
ওষুধঃ পেপটিক আলসারের রোগীরা সাধারণত অ্যান্টাসিড, রেনিটিডিন, ফেমোটিডিন, ওমি প্রাজল, লেনসো প্রাজল, পেনটো প্রাজল জাতীয় ওষুধ সেবনে উপকৃত হন ।
কারণভিত্তিক চিকিৎসাঃ জীবাণুজনিত কারণে যদি এ রোগ হয়ে থাকে তবে বিভিন্ন ওষুধের সমন্বয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়, যা ট্রিপল থেকে থেরাপি নামে পরিচিত।
অপারেশনঃ পেপটিক আলসারের ক্ষেত্রে অপারেশন সাধারণত জরুরি নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবনের পরও যদি রোগী ভালো না হন, তবে কিছু খেলে যদি বমি হয়ে যায় অর্থাৎ পৌষ্টিক নালীর কোনো অংশ যদি সরু হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে রোগী উপকৃত হতে পারেন।
সময়মতো পেপটিক আলসারের চিকিৎসা না করলে রোগীর নিুলিখিত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে। যেমন­
১। পাকস্থলী ফুটা হয়ে যেতে পারে;
২। রক্ত বমি হতে পারে;
৩। কালো পায়খানা হতে পারে;
৪। রক্তশূন্যতা হতে পারে;
৫। ক্যান্সার হতে পারে (কদাচিৎ) এবং
৬। পৌষ্টিক নালীর পথ সরু হয়ে যেতে পারে এবং রোগীর বারবার বমি হতে পারে।
কাজেই যারা দীর্ঘমেয়াদি পেপটিক আলসারে ভুগছেন তাদের উচিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। পেপটিক আলসার-জনিত জটিলতা আগে থেকেই শনাক্ত করা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়া। প্রয়োজনে অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ধরে না রেখে সুস্থ-সুন্দর-স্বাভাবিক জীবনযাপন করা।

লেখকঃ বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। চেম্বারঃ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫, সাতমসজিদ রোড, (জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড) ধানমন্ডি, ঢাকা
ফোনঃ ০১৭২৬৭০৩১১৬


ল্যাপারোস্কপিক সার্জারি
পেট না কেটে অপারেশন
ডা. হামিদা বেগম

চিকিৎসা বিজ্ঞানী অ্যান্ডোস্কোপি সার্জারি বা মিনিম্যাল এক্সেস সার্জারি (এমএএস) যাকে ল্যাপারোস্কপি বলা হয়­ নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। জার্মানির শ্যাম ও লিন্ডারম্যান, ফ্রান্সের ব্রুহাটও হ্যাময়, ইংল্যান্ডের স্যাটন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রিচও গোল্ডরথে ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ সালে অ্যান্ডোস্কোপি সার্জারিতে এক বৈপ্নবিক পরিবর্তন আনেন। শল্য চিকিৎসায় প্রথম পিত্ত থলি অপারেশন (ল্যাপকলি) হয় ১৯৮৫ সালে। ১৯৮৭ সাল থেকে এটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। আর বর্তমান সময়ে ল্যাপারোস্কপি শল্য চিকিৎসার এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়েছে যে এটিকে চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড
বলা হয়ে থাকে।
পদ্ধতিঃ নাভির নিচে ১ বা ১.৫ সেমি কেটে যন্ত্র ঢুকিয়ে পেটের মধ্যে কার্বন ডাই অক্সাইড প্রবেশ করিয়ে ন্যামোপেরিটানয়ম তৈরি করা হয়। এর ফলে পরিপাকতন্ত্র নিচে সরে যায়। এর ফলে অতি সহজে দেখে দেখে রোগ সনাক্ত করা যায়। এটি টিভি মনিটরিংয়ে ১০ থেকে ৪০ গুণ বড় করে দেখানোর ফলে রোগ সনাক্তে আরো সহজ হয়। প্রয়োজনে আরো ২-৩ টি ছোট ছিদ্র করেও যন্ত্র ঢুকিয়ে কাজ করা হয়। স্ত্রী রোগ চিকিৎসার জন্য নিচে ভ্যাজাইনা দিয়ে টেনেকুলাম দিয়ে উপরে-নিচে বা সামনে -পেছনে এনে (সহকারী) সার্জনকে উপর থেকে কাজ করতে সাহায্য করেন। ১৯৮৯ সালে হ্যারি রিচ প্রথমে ফাইব্রো অপটিকস অ্যান্ডোস্কোপ বা ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে জরায়ু অপারেশন (ল্যাপারোস্কপি অ্যাস্টিটেড ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি বা এলএভিএইচ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন যা এত দিন শুধু পেট কেটেই করা হতো। এখন পিত্তথলি, স্ত্রীরোগ চিকিৎসা ছাড়াও মুত্র থলি বিষয়ক এপিন্ডিসেক্টমি, শিশু জন্মগত পরিপাকতন্ত্রে সমস্যা, হার্নিয়া অপারেশন, এপিআর (অ্যাবডোমিনু পেরিনেটাল রিসেকশান), মস্তিষ্কে টিউমার, থাইরয়েড গ্রন্থি টিউমার ইত্যাদি রোগে এ চিকিৎসা অভূতপূর্ব সাফল্য এনেছে।
যন্ত্রপাতি
ভেরেস নিডিলঃ পেটে ছোট ছিদ্র করে গ্যাস প্রবেশ করানোর জন্য উন্নত ধরনের ল্যান্স সিস্টেম বা টেলিস্কোপ, লাইট সোর্সঃ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট (জেনন বা হ্যালোজেন); মাইক্রোচিপ ভিডিও ক্যামেরা; অপারেশন কক্ষে ভিডিও মনিটরিং ও থ্রি ডাইমেনশনাল ইমেজ সিস্টেম। সর্বোপরি ইনসাফ্লেটর (যার মধ্যে বাতাস ভর্তি থাকে)।
স্ত্রী রোগ বিষয়ে চিকিৎসার জন্য অ্যান্ডোস্কোপিকে দুভাগে ভাগ করা যায়। ১) ল্যাপারোস্কপিতে রোগ সনাক্তকরণ ও চিকিৎসা দুইই সম্ভব। হিস্টেরোস্কোপিঃ এর মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে প্যানোরোমিক ভিউ বা পুরোটা সব দিক থেকে দেখা ও প্রয়োজন মতো অপারেশন সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রোগীকে পুরোপুরি অজ্ঞান করারও প্রয়োজন নেই। শক্ত নল জরায়ুর ভেতরে ঢুকিয়ে নরমাল স্যালাইন দিয়ে প্রসারিত করে দেখা হয়।
এর ব্যবহার
মাসিক বন্ধ হবার আগে অথবা পরেও অনিয়মিত ঋতুস্রাব যা ওষুধে নিয়ন্ত্রণ আসেনি এমন; জরায়ুতে পলিপ, ছোট টিউমার অপসারণ; বারবার অন্যান্য কারণ ছাড়া গর্ভপাত হওয়া যেমন জরায়ুর গঠনগত সমস্যা, পর্দা থাকা; জরায়ুতে ফরেন বডি বা আইইউসিডি শক্ত হয়ে বসে থাকা; জরায়ু মুখ, জরায়ু ভেতর বা কোনায় লেগে থাকা; মাসিকের মাঝামাঝি সময়ে রক্ত যাওয়া বা সহবাসের পর রক্ত যায় জরায়ু মুখ স্বাভাবিক থাকার পরও।
ল্যাপারোস্কপির ব্যবহারঃ
সানক্তকরণ (ডায়গনোসিস)ঃ বন্ধ্যা নারীর জন্য টিউব বা ডিম্বনালী ঠিক আছে কি না, টিউবের পাশে অ্যাডেসান আছে কি না, ওভারি ঠিক আছে কি না, এতে ডিম ঠিকমতো পরিপক্ক ও বের হয় কি না (ওভোলেশন), পরিসিস্টিক ওভারি কি না দেখে সনাক্ত করা যায়।
পেলভিক পেইনের জন্যঃ অ্যান্ডোমেট্রিওসসিস, পিআইডি, টিউবে বাচ্চা ইত্যাদিতে।
মাসিক একেবারে (প্রাইমারি), বা পরে না হওয়া (সেকেন্ডারি অ্যামেনোরিয়া) জরায়ু না থাকা (এজেনেসিস), ওভারি বা ডিম্বাশয় না থাকা (স্ট্রিক গোনাড বা ডিসজেনেসিস)।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে (ট্রিটমেন্ট বা সার্জারি)ঃ অ্যাক্টোপিক বাচ্চা ফেটে যাবার আগে বা পরে, পেলভিক পেইনে, লেগে থাকা ছুটানো (অ্যাঢেসিওলাইসিস), পলিসিস্টিক ওভারির চিকিৎসা, ওভারিতে পানি ভর্তি টিউমার চিকিৎসা (ওভারিয়ান সিস্ট),
জরায়ু টিউমার অপসারণ (মাইওমেক্টমি)ঃ জরায়ু অপসারণ (এলএভিএইচ), টিউব বন্ধ বা লাইগেশন করাঃ ক্লিপ রিং দিয়ে বা ব্যান্ড দিয়ে।
কখন ল্যাপারোস্কপি করা যাবে নাঃ পেটের ভেতরে খারাপ প্রদাহ (সিভিয়র পেরিটোনিটিস), পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা (প্যারালাইটিক আইলিয়াস), খারাপ ধরনের রক্তক্ষরণ সমস্যা (বি্নডিং ডিসওর্ডার), পেটে আগে অস্ত্রোপচার করা হয়ে থাকলে, তল পেটে অনেক বড় টিউমার
ল্যাপারোস্কপির সুবিধাসমুহঃ কম রক্ত ক্ষরণ, কম ব্যথা ও কম ওষুধ, কম সময় হাসপাতালে থাকা, দ্রুত ভালো হওয়া ও কাজে যোগদান, পেটে কোনো বড় দাগ না থাকা
অসুবিধাসমূহঃ অর্থনৈতিক, এ চিকিৎসা গ্রহণের মানসিকতা, এজাতীয় চিকিৎসা ক্ষেত্রে তুলনামুলক ব্যয় একটু বেশি।
গাড়ির চালক বা পে্ননের পাইলট যেমন চোখ, কান অর্থাৎ পঞ্চইন্দ্রিয় এক করে সমগ্র মনোনিবেশ করেন তেমনি ল্যাপারোস্কপির মাধমে চিকিৎসার প্রয়োজন দক্ষ সার্জন যিনি এর যন্ত্র ও এদের ব্যবহার, থ্রি ডাইমেনশন এনাটমি সম্বন্ধে এবং কোনো সমস্যা হলে (রক্তক্ষরণ বা হঠাৎ জরুরি অংশ কেটে গেলে যিনি সামলে নিতে পারবেন শুধু তিনিই এ চিকিৎসায় সফল হবেন। এজন্য সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার ও সঠিক রোগ চিহ্নিত করা জরুরি।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
ফোনঃ ০৮১৯২৪৩৬১৯
গ্রন্থনাঃ ডা. সানজিদা ইব্রাহিম


পেটে ব্যথায় সার্জারি

মাথা থাকলে যেমন মাথা ব্যথা হয় তেমনি পেট থাকলে পেটে ব্যাথাও হবে এটাই স্বাভাবিক। শিশু থেকে শুরম্ন করে যেকোন বয়সেই পেট ব্যথা হয়ে থাকে। বেশিরভাগ পেট ব্যথাই ড়্গণস্থায়ী এবং ঔষধ খেয়েই ভাল হয়ে যায়। কখনো কখনো পেট ব্যথা এত তীব্র ও জীবন বিপন্ন করে তোলে যে শৈল্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয় এবং শৈল্য চিকিৎসারও প্রয়োজন পড়ে। এবার আমার পেট ব্যথার প্রধান কারণগুলো লড়্গ্য করি।

যেগুলোর জন্য আপনারা অবশ্যই শৈল্য

চিকিৎসকের সাহায্য নিবেন

১জ্ঝ এপেনডিসাইটিস। ২জ্ঝ কলিসিসটাইটিস অর্থাৎ পিত্তথলি বা গলবস্নাডার-এর প্রদাহ পাথরজনিত অথবা পাথরবিহীন। ৩জ্ঝ ইনটেসটিনাল অবস্ট্রাকশন/ খাদ্যনালীর পথরোধ হওয়া রোগ। ৪জ্ঝ পাকস্থলি বা খাদ্যনালী (ইনটেসটিন) ফুটো হয়ে যাওয়া। ৫জ্ঝ একিউট একজারবেসন অব পেপটিক আলসার।

৬জ্ঝ কিডনি, মূত্রনালী ও মূত্রথলীতে পাথর/ ইনফেকশন। ৭জ্ঝ পিত্তনালীর পাথর। ৮জ্ঝ অগ্নাশায় বা পেনক্রিয়াসের প্রদাহ/ বা পেনক্রিয়াটাইটিস/ পেনক্রিয়াসের পাথর। ৯জ্ঝ রাপচার একটোপিক প্রেগনেন্সি প্রধান।

পেট ব্যথার এ পর্যায়ে আমরা আজ সবচেয়ে কমন যে কারণটির জন্য আপনারা সার্জনের (চিকিৎসক) শরণাপন্ন হন তা নিয়ে আলোচনা করব।

পেট ব্যথা এবং এপেনডিসাইটিস

এপেনডিসাইটিস মানে এপেনডিকস নামক ড়্গুদ্র অঙ্গটির প্রদাহ। এই এপেনডিকস অঙ্গটি পেটের নাভির ডানদিকে অবস্থিত। এটা দেখতে অনেকটা ওয়ার্ম বা কৃমির মত এবং এটা খাদ্যনালীর বৃহদন্ত্রের অংশ। রোগ প্রতিরোধে এর ভূমিকা আছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এই অঙ্গহানির ফলে শরীরের কোন ড়্গতি হয় না।

এপেনডিসাইটিস কেন হয়ঃ

বিভিন্ন কারণে এপেনডিসাইটিস হতে পারে যেমন-

১জ্ঝ ফিকুলিথ (শক্ত মলের নুড়ি) দ্বারা এপেনডিকসের প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে। ২জ্ঝ হজম না হওয়া খাদ্যের অংশ যেমন টমেটোর খোসা দ্বারা এপেনডিকসের প্রবেশমুখ বন্ধ হয়। ৩জ্ঝ গুঁড়া কৃমির দ্বারা এবং ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন হয়ে এপেনডিসাইটিস হতে পারে।

এপেনডিসাইটিস রোগের লড়্গণসমূহঃ

১জ্ঝ রোগী বলবে প্রথমে আমার ব্যথা নাভির চারপার্শ্বে অথবা পেটের উপরিভাগে শুরম্ন হয়েছিল এবং ২/৩ ঘণ্টা পর এ ব্যথা সরে এসে নাভির ডানপার্শ্বে অবস্থান নিয়েছে।

২জ্ঝ হাঁচি, কাশি দিলে নাভির ডানপার্শ্বে ব্যথা হয়।

৩জ্ঝ বমিভাব বা ১/২ বার বমি হতে পারে।

৪জ্ঝ ড়্গুধা নেই। ৫জ্ঝ হাল্কা জ্বর ভাব।

৬জ্ঝ কনস্টিপেশন এবং কিছু ড়্গেত্রে ডায়রিয়াও হতে পারে।

৭জ্ঝ পরীড়্গা করলে নাভির ডানদিকে চাপ দিলে ব্যথা অনুভব করবে বা ব্যথার জন্য ধরাই যাবে না।

রোগীর ইতিহাস ও লড়্গণগুলো থেকেই ৯০ ভাগ ড়্গেত্রে এই রোগ নিরূপণ করা হয়। সেইসাথে রক্ত, প্রস্রাব, এরে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম (মেয়েদের ড়্গেত্রে) করে পেট ব্যথার অন্য কারণগুলো বাদ দিয়ে এপেনডিসাইটিস রোগ ডায়াগনোসিস কনফার্ম করা হয়।

মেয়েদের ড়্গেত্রে এ রোগ নির্ণয় ছেলেদের তুলনায় কঠিন হয়। কারণ নাভির ডানপাশে ব্যথা মেয়েলী কারণেও হতে পারে, যেমন ৈওভুলেশন পেইন, ডিম্বাশয়ের কারণে ব্যথা, টিউবাল প্রেগনেন্সির (জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ) জটিলতার কারণে ও প্রস্রাবে ইনফেকশন ইত্যাদির কারণে ব্যথা। এসব ড়্গেত্রে অবশ্যই রোগিনীর ভালভাবে পূর্ব ইতিহাস ও পরীড়্গা নিরীড়্গা করে নিতে হবে। প্রয়োজন হলে লেপারোস্কোপিক পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।

চিকিৎসা

দ্রম্নত অপারেশনই এ রোগের সঠিক চিকিৎসা।

অপারেশন না করলে কি ড়্গতি হতে পারে?

১জ্ঝ চাকা (লাম্পা) হয়ে যেতে পারে। যা কিনা ভাল হতে ২/৩ সপ্তাহ লেগে যায় এবং খরচও অপারেশনের চেয়ে বেশি হয়।

২জ্ঝ ফোঁড়া বা এবসেস হয়ে যেতে পারে।

৩জ্ঝ গেংগ্রিন, ফুটো বা বার্স্ট হয়ে যেতে পারে এবং জীবন-মরণ সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৪জ্ঝ ভাল হয়ে আবার বারবার দেখা দিতে পারে।

অতএব, উপরের জটিলতাগুলো চিন্তôা করে যত দ্রম্নত সম্ভব অপারেশন করে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


বিরক্তিকর পেটের সমস্যা
পেটের কোনো সমস্যাই সুখকর নয়। তবে কিছু সমস্যা আছে যেগুলো খুবই বিরক্তিকর এবং কষ্টদায়ক। যেমন ঠিকমতো পায়খানা না হওয়া কিংবা বেশি বেশি পেট খারাপ হওয়া। চিকি[্‌ৗ২৫১০;]সকরা পেটের এ সমস্যার নাম দিয়েছেন আইবিএস বা ইরিট্যাবল বাওয়েল সিনড্র[্‌ৗ২৫০৭;]ম। কবিরাজ ভাই এবং তাদের অনুগতরা অবশ্য একে পুরনো আমাশয় বলে থাকেন। এ রোগটি থেকে মুক্তি পেতে আজকের লেখার সাহায্য নিতে পারবেন।
রোগের লক্ষণ
তলপেটে ব্যথা হয়। ব্যথা মোচড় দিয়ে শুরু হয় এবং পায়খানা করার পর ব্যথা কমে যায়।
পেটের মধ্যে সারা দিন বুদবুদ আওয়াজ হতে থাকে। মনে হয় পেটের মধ্যে গ্যাস ভরে আছে।
কখনো পাতলা পায়খানা, কখনো কষা পায়খানা (কনস্টিপেশন) হয়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে সব সময় পাতলা পায়খানা বা কষা পায়খানা হয়।
যাদের সব সময় পাতলা পায়খানা হয় তাদের ক্ষেত্রে প্রথমে পেটে ব্যথা হয় এবং পরে পাতলা পায়খানা হওয়ার পর তা কমে আসে। ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয় এবং প্রতিবার খুব অল পরিমাণে পায়খানা হয়।
ঘুমের মধ্যে সাধারণত কখনোই পায়খানার বেগ হয় না।
পায়খানার সময় প্রচুর পরিমাণে আম বা মিউকাস যায়। আম যায় বলে অনেকে অজ্ঞতাবশত একে আমাশয় বলে।
যাদের কষা পায়খানার প্রবণতা বেশি তারা পেটে ব্যথা নিয়ে টয়লেটে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেও অতৃপ্তি নিয়ে টয়লেট থেকে বের হতে হয়।
পায়খানা সমস্যা থাকলেও এসব রোগীর ওজন তেমন হ্রাস পায় না।
পায়খানার সমস্যার পাশাপাশি এসব রোগীর ক্ষুধামন্দা, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, মাথা ব্যথা, পিট ব্যথা, অলতেই ক্‌ৗ৮৭২২;ান্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা থাকতে পারে।
রোগের কারণ
প্রায় ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগটি মানসিক কারণে হয়ে থাকে। সকালে বাথরুম সেরে অফিসে যাওয়ার জন্য প্যান্ট-শার্ট পরেছেন অমনি দেখা যায়, তলপেট মোচড় দিয়ে ব্যথা ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে টয়লেটে দৌড়। দূরে কোথাও যাবেন তাই বাসে উঠেছেন। যখন মনে হবে বাসে তো বাথরুম করার সুযোগ নেই অমনি দেখবেন তলপেটে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। প্রস্রাব-পায়খানা যতোই পরীক্ষা করান না কেন এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা পাওয়া যাবে না। যারা সবসময় দুশ্চিন্তায় ভোগেন,ে স্ট্রস যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়।
পুকুরে ঢিল ছুড়লে পানি যেমন তরঙ্গের আকারে পাড়ের দিকে এগিয়ে যায়, পেটের নাড়িভুড়িও তেমনি তরঙ্গের আকারে খাদ্যজাত বর্জø পদার্থ পায়খানার আকারে বের করে দেয়। অন্ত্রের সংকোচন প্রসারণের মাধ্যমে এ গতিময় তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। কোনো কারণে এ সংকোচন প্রসারণের পরিমাণ বেড়ে গেলে পাতলা পায়খানা এবং কমে গেলে কষা পায়খানা হতে পারে।
কিছু মানুষ আছে যারা সামান্য কথাতেই মুখ গোমড়া করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। তেমনিভাবে কোনো কারণে অন্ত্রের সংবেদনশীলতা বেড়ে গেলে ঘন ঘন পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অন্ত্রের প্রদাহের কারণে অনেকের ঘন ঘন পায়খানার সমস্যা হতে পারে। এছাড়া দুগজাত খাবারসহ অনেক খাবার আছে যেগুলো অনেকে হজম করতে পারে না। আইবিএস তাদের ক্ষেত্রেও হতে পারে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষা
লক্ষণ বা ধরন দেখেই এ রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো যেতে পারে। পায়খানা পরীক্ষা, রক্তের কিছু পরীক্ষা, সিগময়ডোস্কপি ইত্যাদি করানো যেতে পারে। এছাড়া যাদের প্রধানত পাতলা পায়খানা হয় তাদের ক্ষেত্রে টেস্ট করে দেখতে হবে তারা মাইক্র[্‌ৗ২৫০৭;]স্কপিক কোলাইটিস, ল্যাকটোজ ইনটল্যারেন, বাইল এসিড ম্যাল অ্যাবজরপশন ইত্যাদি রোগে ভুগছেন কি না। পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে কোলোনোস্কপি, ব্যারিয়ার এনেমা ইত্যাদি পরীক্ষা করে দেখতে হবে কোনো ক্যানারের লক্ষণ আছে কি না।
চিকি[্‌ৗ২৫১০;]সা
এ রোগের চিকি[্‌ৗ২৫১০;]সায় প্রথম কথা হলো রোগীকে অভয় দেয়া, সাহস যোগানো। সাহস দেয়া মানে এই নয় যে, রোগীকে বোঝানো, ভাই টেনশন করবেন না, রোগটা ভালো হলে ঠিক হয়ে যাবে। রোগীকে বোঝাতে হবে এটা খুবই সাধারণ একটা সমস্যা। এতে ভয়ের কিছু নেই। টেনশনমুক্ত জীবনযাপন করলে, আত্মবিশ্বাস বাড়ালে এবং খাবারের বিষয়ে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে এ রোগ এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
যাদের পাতলা পায়খানা বেশি হয় তারা অবশ্য শাক-সবজি বা ফাইবার জাতীয় খাবার খুব কম খাবেন। এতে কাজ না হলে ডায়ারিয়া রোধী ওষুধ যেমন- লোপেরামাইড, কোডেইন ফসফেট, কোলেস্টাইরামিন ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারেন। এতেও কাজ না হলে অ্যামিট্রিপটাইলিন (২৫ মিজ্ঝগ্রাজ্ঝ) প্রতি রাতে কমপক্ষে তিন মাস খেয়ে দেখতে পারেন। অন্যদিকে যাদের কষা পায়খানা বেশি হয় তাদের উচিত বেশি পরিমাণে শাক-
সবজি খাওয়া। এতেও কাজ না হলে ইসবগুলের ভুষি খাওয়া যেতে পারে। বাজারে টেগরোটোল গ্রুপের ওষুধ পাওয়া যায় যা সেবনে এ ধরনের রোগীরা বেশ ভালো ফল পেতে পারেন।
তলপেটে ব্যথা বা বুদবুদ আওয়াজ কমাতে মেবেভারিন গ্রম্নপের ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।
সুখ ভোগে না ত্যাগে তা বোঝা যায় টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর। আপনি খুব বেশি তৃপ্ত হয়ে একমাত্র মেয়ের নাম তৃপ্তি রাখতেই পারেন। কিন্তু সেই তৃপ্তি আইবিএসের মতো বিরক্তিকর পায়খানার সমস্যায় ভুগলে সব সময় অতৃপ্ত মন নিয়ে তাকে টয়লেট থেকে বের হতে হবে। ফলে ছন্দায়িত জীবন গদ্যময় হয়ে যাবে। পেটের এ ধরনের সমস্যায় তাই অবশ্যই একজন মেডিসিন বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। ভালো কথা, আম যাওয়া মানেই কিন্তু আমাশয় নয়। পায়খানার রাস্তাকে মসৃণ রাখার জন্য বিধাতা গ্রিজের মতো করে সেখানে আমের নিঃসরণ ঘটান। তাই এ জাতীয় সমস্যায় বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, ভোগে নয় ত্যাগেই সুখী হোন।
লেখকঃ ডাজ্ঝ সাকলায়েন রাসেল
উ[্‌ৗ২৫১০;]সঃ দৈনিক যায়যায়দিন, ২৮শে নভেম্বর ২০০৭


কোষ্ঠকাঠিন্যঃ কারণ ও প্রতিকার
অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

হেদায়েত সাহেবের বয়স চল্লিশের মতো। ভালো চাকরি করেন। হঠাৎ করে বেশ কিছু দিন যাবৎ তার শক্ত পায়খানা হচ্ছে, পায়খানায় দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরও মনে হচ্ছে পায়খানা ঠিক ক্লিয়ার হচ্ছে না, তাকে খুবই বিষণ্ন মনে হচ্ছে, দিন দিন কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছেন। পায়খানার সাথে রক্ত যায় কি না তাকে জিজ্ঞেস করলে বলেন, খেয়াল করিনি, স্যার। তারপর তাকে পরীক্ষা করলাম, প্রোক্টোস্কোপি ও সিগময়ডোস্কোপি টেস্ট করলাম, তারপর দেখতে পেলাম তার কোলনে অর্থাৎ অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার।
হেদায়েত সাহেব যে উপসর্গগুলো নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন তা মূলত কোষ্ঠকাঠিন্যের। কিন্তু এ কোষ্ঠকাঠিন্য কী, কেন হয় তা আমরা কিভাবে প্রতিরোধ করতে পারি এবং সময়মতো এর চিকিৎসা না করলে কী কী পরিণতি হতে পারে সে বিষয়েই এখন আমরা আলোচনা করব।
কেউ যদি প্রতি সপ্তাহে তিন বারের কম পায়খানায় যায়, পর্যাপ্ত পরিমাণ আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করার পরও তখনই একে বলব কোষ্ঠকাঠিন্য।
কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ
১. আঁশজাতীয় খাবার এবং শাকসবজিও ফলমূল কম খেলে;
২. পানি কম খেলে;
৩. দুশ্চিন্তা করলে;
৪. কায়িক পরিশ্রম, হাঁটাচলা কিংবা ব্যায়াম একেবারেই না করলে;
৫. অন্ত্রনালীতে ক্যান্সার হলে
৬. ডায়াবেটিস হলে
৭. মস্তিষ্কে টিউমার হলে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে;
৮. অনেক দিন বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে বিছানায় শুয়ে থাকলে;
৯. বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন যেমন­
ক. ব্যথার ওষুধ
খ. উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ
গ. গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ
ঘ. খিঁচুনির ওষুধ এবং
ঙ. যেসব ওষুধের মধ্যে আয়রন, ক্যালসিয়াম ও অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় খনিজ পদার্থ থাকে। তা ছাড়া স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার জন্যও কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। এর মধ্যে কাঁপুনিজনিত অসুখ, স্নায়ু রুজ্জু আঘাতপ্রাপ্ত হলে, কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা ও থাইরয়েডের সমস্যা উল্লেখযোগ্য।
কোষ্ঠকাঠিন্যের লক্ষণ
১. শক্ত পায়খানা হওয়া;
২. পায়খানা করতে অধিক সময় লাগা;
৩. পায়খানা করতে অধিক চাপের দরকার হওয়া;
৪. অধিক সময় ধরে পায়খানা করার পরও পূর্ণতা না আসা;
৫. মলদ্বারের আশপাশে ও তলপেটে ব্যথার অনুভব করা এবং
৬. আঙুল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে পায়খানা বের করা।
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উপায়
১. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য বেশি করে শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে; ২. বেশি করে পানি খেতে হবে; ৩. দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে; ৪. যারা সারাদিন বসে বসে কাজ করেন তাদের নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে এবং ৫. যেসব রোগের জন্য কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তার চিকিৎসা করতে হবে।
কোষ্ঠকাঠিন্য চিকিৎসা না করা হলে যে সমস্যা হতে পারে­
১. পায়খানা ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে; ২. পাইলস; ৩. এনাল ফিশার;
৪. রেকটাল প্রোলাপস বা মলদ্বার বাইরে বের হয়ে যেতে পারে; ৫. মানসিকভাবে রোগাক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে; ৬. প্রস্রাব বন্ধ হতে পারে; ৭. খাদ্যনালীতে প্যাঁচ লেগে পেট ফুলে যেতে পারে; ৮. খাদ্যনালীতে আলসার বা ছিদ্র হয়ে যেতে পারে এবং ৯. কোষ্ঠকাঠিন্য যদি কোলন ক্যান্সার এবং মস্তিষ্কে টিউমারের জন্য হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা করা না হয় তবে অকাল মৃত্যুও হতে পারে।
কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য অনেকে প্রতিনিয়ত পায়খানা নরম করার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ; সিরাপ এবং মলদ্বারের ভেতরে দেয়ার ওষুধ ব্যবহার করে থাকেন, যা মোটেও উচিত নয়। প্রতিনিয়ত পায়খানা নরম করার ওষুধ ব্যবহার করলে সেটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। ফলে মলদ্বারে স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা আর থাকে না। তাই বয়স্ক এবং যারা পরিশ্রমের কাজ করেন না তাদের মধ্যে যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তাদের উচিত কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ নির্ণয় করে সে হিসেবে চিকিৎসা নেয়া। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার জন্য ইসুবগুলের ভূষি পানিতে ভিজিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেললে এবং গরু, খাসি ও অন্যান্য চর্বিযুক্ত খাবার যেগুলো মল শক্ত করে তা থেকে দূরে থাকলে অনেকে উপকৃত হতে পারেন।
লেখকঃ বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ
চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
চেম্বারঃ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। মোবাইলঃ ০১৭২৬৭০৩১১৬


অ্যাপেনডিসাইটিস

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

তলপেটে হঠাৎ করে ব্যথা উঠলেই অনেকে মনে করে থাকেন অ্যাপেনডিসাইটিসের ব্যথা। জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন দরকার। আসলে কথাটা সঠিক নয়। পেটে ব্যথা অ্যাপেনডিসাইটিস ছাড়াও বহুবিধ কারণে হতে পারে। ওষুধের মাধ্যমেও পেটের ব্যথা থেকে নিরাময় হওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে।
অ্যাপেনন্ডিক্স হচ্ছে ছোট নলাকার একটি অঙ্গ যা বৃহদন্ত্রের সাথে সংযুক্ত থাকে। লম্বায় ২-২০ সে.মি.। কোনো কারণে অ্যাপেনন্ডিক্সের মধ্যে ইনফেকশন হলে এটি ফুলে যায়, প্রদাহ হয়, তখন একে বলা হয় অ্যাপেনডিসাইটিস।
উপসর্গগুলো
সাধারণত প্রথমে ব্যথা নাভির চারপাশে অনুভব হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর ব্যথাটা তলপেটের ডান পাশে চলে আসে। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে পেটের অন্য অংশেও ব্যথা হতে পারে।
১. বমি বমি ভাব হতে পারে;
২. বমিও হতে পারে;
৩. অরুচি হতে পারে;
৪. পাতলা পায়খানা হতে পারে এবং
৫. জ্বর হতে পারে।
এ রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের রোগীর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষাই বেশি জরুরি। আলট্রাসনোগ্রাম কিংবা রক্ত পরীক্ষা অ্যাপেনডিসাইটিস নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে। তবে এ রোগ নির্ণয়ে চিকিৎসকের অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ। পেটের ডান দিকে নিচের অংশে অনেক কারণে ব্যথা হতে পারে, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। তাই এ রোগে অপারেশনের আগে চিকিৎসককে অবশ্যই অন্য কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হবে। তবে অ্যাপেনডিসাইটিস হলে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হচ্ছে অপারেশন। কারো অ্যাপেনডিসাইটিস হলে যদি অপারেশন করা না হয় তাহলে অ্যাপেনন্ডিক্স ছিদ্র হয়ে যেতে পারে, ইনফেকশন পুরো পেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং জীবন বিপন্ন হতে পারে।
লেখকঃ বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ, চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধ ু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। চেম্বারঃ জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ৫৫ সাত মসজিদ রোড (জিগাতলা বাস স্ট্যান্ড), ধানমন্ডি, ঢাকা।
ফোনঃ ০১৭২৬৭০৩১১৬, ০১৭১৫০৮৭৬৬১।


ক্রনিক আমাশয় বা আইবিএস

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

এক তরুণের বয়স ২২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বেশ কিছু দিন ধরে এক জটিল রোগে আক্রান্ত, যা তার পড়াশোনা ও জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। ছয় মাস ধরে তিনি আমাশয়ে ভুগছেন। দিনে চার-পাঁচবার টয়লেটে যেতে হয়। তলপেটে ব্যথা হয়, পায়খানার সাথে মিউকাস বা আম যায়। টয়লেট থেকে আসার পরও মনে হয় পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি এবং মাঝে মাঝে পায়খানার সাথে রক্ত যায়। এসব সমস্যার জন্য নিজে নিজে অনেক ওষুধ খেয়েছেন এবং অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছেন। অনেক রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। ফলে তিনি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে থাকেন এ সমস্যার কি কোনো সমাধান নেই নাকি এটা পায়ুপথের কোনো জটিল সমস্যা, না ক্যান্সার? ওপরের বর্ণনা থেকে আপনারা অনেকেই হয়তো ভাবছেন এটা কী ধরনের রোগ? এর কি কোনো চিকিৎসা এ দেশে নেই?
এ রোগটির নাম ওড়ড়ময়থদলপ ইসাপল ঝীষনড়সশ (ওইঝ) বা সহজ বাংলায় যাকে বলে মানসিক অস্থিরতাজনিত আমাশয় রোগ। জেনারেল প্র্যাকটিশনার থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে পরিপাকতন্ত্রের এই সমস্যা নিয়ে প্রচুর রোগী আসেন। পরিপাকতন্ত্রের এই বিশেষ রোগ নিয়ে গবেষণার কোনো অন্ত নেই। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই রোগের কোনো স্বীকৃত কারণ পাওয়া যায়নি। এ জন্য একে ঋৎষধয়মসষথল নমঢ়সড়নপড়ও বলা হয়।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯-১২ শতাংশ এই রোগে আক্রান্ত। পুরুষ বা মহিলা যে কেউই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। অনুপাত ১০ঃ১১। এই রোগের কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সের যে কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
ওইঝ রোগের নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা না গেলেও বিজ্ঞানীরা বেশ ক’টি ব্যাপারকে এ রোগের জন্য দায়ী বলে মনে করেন। যেমন, মানসিক কারণ, পরিপাকতন্ত্রের পরিবর্তিত চলাচল, পরিপাকতন্ত্রের প্রসারণ সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি। এসব কারণের মধ্যে ৫০ শতাংশ রোগীই মানসিক সমস্যায় ভোগেন। যেমনঃ উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অবসাদগ্রস্ততা, ভয় পাওয়া, মানসিক বিপর্যস্ততা ইত্যাদি। পরিপাকতন্ত্রের পরিবর্তিত আচরণ আরেকটি উল্লেখযোগ্য কারণ।
এই রোগে যেসব উপসর্গ দেখা দেয় তাদের আমরা দু’টি ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হলো পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, অন্যটি হলো অন্যান্য শারীরিক সমস্যা। পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাগুলো হলো তলপেটে ব্যথা, যা টয়লেটে যাওয়ার পর কমে যায়, পেট ফুলে ওঠা। ওইঝ রোগীরা দুই ধরনের সমস্যা নিয়ে ডাক্তারদের কাছে আসতে পারেন। একধরনের রোগীরা আসেন ডায়রিয়াজনিত সমস্যা এবং অন্য ধরনের রোগীরা আসেন কোষ্ঠকাঠিন্যজনিত সমস্যা নিয়ে। আবার অনেক রোগী আসেন যাদের এই দুই ধরনের সমস্যাই থাকে। যেসব রোগী ডায়রিয়াজনিত সমস্যা নিয়ে আসেন তারা প্রায়ই ঘন ঘন টয়লেটে যাওয়া, পরিষ্কারভাবে পায়খানা না হওয়া, আম যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গের কথা বলেন। আর যারা কোষ্ঠকাঠিন্য, পায়খানার রাস্তায় ব্যথা ও পেটে ব্যথা এসব সমস্যায় ভোগেন। ওইঝ-এর অনেক রোগী অনেক সময় মলদ্বারের বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগে থাকেন। ওইঝ-এর বেশিরভাগ মহিলা ও পুরুষ রোগী আবার এনাল ফিশার রোগে ভুগে থাকেন। অনেকে পাইলস রোগে আক্রান্ত হন। এনাল ফিশার বা পাইলস রোগে আক্রান্ত হলে পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্ত যেতে পারে। পায়খানার রাস্তা ফুলে উঠতে পারে, পায়খানার পর জ্বালা-যন্ত্রণা বা ব্যথা করতে পারে। অথবা পায়খানার রাস্তা বের হয়ে আসতে পারে। উপসর্গের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য যে, রোগীর বিশেষ ধরনের খাবার খাওয়ার পর রোগের উপসর্গ প্রকটভাবে দেখা দেয়। বেশ কিছু খাবার রয়েছে যেমনঃ গরুর দুধ, গোশত, চিংড়িমাছ, তৈল জাতীয় খাবার বা মসলাবহুল খাবার। এসব খাবার খেলে রোগীদের পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা দেখা দেয়।
ওইঝ রোগ নিরূপণের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। যেমন­ রক্ত পরীক্ষা, মলদ্বারে বিশেষ ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা (কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি), বিশেষ এক্স-রে করা যেতে পারে। কলোনস্কোপি, সিগময়ডোস্কপি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মাধ্যমে করানো উচিত। কারণ অনেক সময় মলদ্বার ও বৃহদান্ত্রের ক্যান্সার রোগীরাও একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসতে পারেন। বিশেষ ধরনের পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে থাইরয়েড হরমোন পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, দুধ সহ্যক্ষমতা পরীক্ষা ইত্যাদি।
ওইঝ রোগরে চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ধাপ হলো রোগীকে আস্বস্ত করা। বেশিরভাগ রোগীই মনে করেন তাদের ক্যান্সার হয়েছে। এ ব্যাপারে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। ফলে তাদের রোগের উপসর্গ আরো প্রকট হয়ে ওঠে। প্রত্যেক রোগীকে অবশ্যই যথেষ্ট সময় দিতে হবে। ধৈর্যসহ তাদরে সব সমস্যার কথা শুনতে হবে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। তাদের বুঝতে হবে যে এটা দেহের কোনো অঙ্গের রোগ নয়, এটা অনেকটা মানসিক অস্থিরতা ও অন্ত্রের উল্টাপাল্টা আচরণের ফল। যেসব রোগী এসব উপদেশের পরও আশ্বস্ত না হন কেবল তাদের ক্ষেত্রেই চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
প্রত্যেক রোগীর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে ইতিহাস নিতে হবে। যেসব রোগী কোষ্ঠকাঠিন্য ধরনের ওইঝ রোগরে বর্ণণা দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যে যথেষ্ট পরিমাণ আঁশাযুক্ত খাবার আছে কি না, নিয়মিত ব্যায়াম করেন কি না এবং টয়লেটে যথেষ্ট সময় দেন কি না এ ব্যাপারে ইতিহাস নিতে হবে। এসব রোগীকে খাদ্যে আঁশযুক্ত খাবার বেশি করে খেতে বলতে হবে, যেন কোষ্ঠকাঠিন্য কমে আসে। অন্য দিকে যেসব রোগীর ডায়রিয়াজনিত ওইঝ থাকে তাদের খাদ্যের তালিকা থেকে অতিরিক্ত শর্করা জাতীয় খাবার, ফল, চা ইত্যাদি কম করে খেতে বলতে হবে। এ ছাড়াও যেসব খাবার খেলে (যেমন­ দুধ, পোলাও ও চিংড়ি) যাদের সমস্যা হয়, তা খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, দুধ বা দুধজাতীয় খাবার বাদ দিলে তারা বেশ ভালো থাকেন।
যেসব রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে পুরোপুরি বুঝিয়ে বলা এবং আশ্বস্ত করার পরও উপসর্গ পুরোপুরি না যায়, কেবল তাদের ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধের বেশিরভাগই তল পেটের ব্যথানাশক এবং অবসাদ, হতাশা দূর করার ওষুধ।
যেসব রোগীর খুব ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয় বা পায়খানা এলে ধরে রাখতে পারেন না, কেবল তাদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া প্রতিরোধকারী ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য ধরনের ওইঝ রোগীদের ক্ষেত্রে আঁশজাতীয় খাবারের পাশাপাশি ইসবগুলের ভূসি খাবার জন্য উপদেশ দেয়া হয়।
অনেক রোগী, যার ওইঝ-এর পাশাপাশি মলদ্বারে বিভিন্ন সমস্যা যেমন এনাল ফিশার বা পাইলস বা মলদ্বার বের হয়ে আসা রোগে আক্রান্ত হয় তাদের অবশ্যই বৃহদন্ত্র ও মলদ্বারের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশই সব ধরনের উন্নত চিকিৎসার প্রচলন রয়েছে।
লেখকঃ বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি বিশেষজ্ঞ
চেয়ারম্যান, কলোরেকটাল সার্জারি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হসপিটাল, ৫৫ সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোনঃ ০১৭২৬৭০৩১১৬, ০১৭১৫০৮৭৬৬১


পিত্তপাথর ও ল্যাপারোস্কপি

পিত্তপাথর অতি বড় অসুখ। এই অসুখটি প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষের মাঝে দেখা যায়। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, অষ্ট্রেলিয়াসহ সর্বত্র এর বিস্তôার লড়্গণীয়। সর্বাধিক দেখা যায় সুইডেনে যেখানে শতকরা হার ৩৮ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়াতে শতকরা ১৫ থেকে ২৫ ভাগ পাওয়া যায়। সর্বনিম্ন হার দেখা যায় আয়ারল্যান্ডে মাত্র শতকরা ৫ ভাগ।পুরম্নষের তুলনায় মহিলাদের এই রোগের হার দ্বিগুণ। যথাক্রমে শতকরা হার ৮৯ ভাগ থেকে ৭৩ ভাগ পর্যন্তô। আফ্রিকাতে এর হার খুবই কম যায় শতকরা হার ১ ভাগেরও কম।

পিত্তপাথরের প্রকারভেদঃ পিত্তপাথরের কারণকে দুইভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে যথা (১) পুরাতন-জনিত কারণঃ যেমন প্রদাহজনিত, মেটাবলিজমজনিত, স্থবিরতাজনিত।

(২) বর্তমান কারণ যথাক্রমে (ক) কোলেস্টরল পাথর (খ) কালো রঙের পাথর (গ) বাদামী রঙের পাথর।

(ক) কোলেস্টরল পাথরঃ শতকরা ৭৫ ভাগ পাথর এই শ্রেণীভুক্ত। সাধারণত সংখ্যায় অধিক। একটি মাত্র পাথর হলে তা বিরাট আকার ধারণ করে।

(খ) কালো রঙের পাথরঃ এই পাথর সংখ্যায় অনেক বেশী এবং ছোট আকারের হয়। সাধারণত রক্ত কণিকা ভেঙে গেলে এই রঙের পাথর দেখা দেয়। এর সাথে শতকরা ২০ ভাগ ইনফেকশন থাকে।

(গ) বাদামী রঙের পাথরঃ এই পাথর তৈরী হয় পিত্তনালীতে।

কখন পাথর হয়ঃ (১) বয়স বাড়ার সাথে এই রোগের প্রবণতা বাড়ে। (২) জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি সেবনে পাথরের হার বৃদ্ধি পায় কম বয়সী মহিলাদের ড়্গেত্রে।

রোগের লড়্গণ সমূহঃ

(১) পেটে ব্যথাঃ উপর পেটের মাঝখানে ও ডান পার্শ্বে ব্যথা থাকে। এই ব্যথা হালকাভাবে এবং কখনো তীব্রভাবে হয়ে থাকে। ব্যথার স্থায়ীত্ব ৩ ঘন্টা থেকে ৩ দিন পর্যন্তô থাকে। এরপর ২ সপ্তাহ থেকে ৬ মাস পর্যন্তô ভাল থাকে। অনেক সময় এই ব্যথা ডান পার্শ্বের ঘাড়ে চলে যায়। তীব্র ব্যথা হলে রোগী কোন অবস্থায় স্বস্তিô পায়না এবং এর সাথে বমি থাকে ও জ্বর হয়। পেট ফাঁপা থাকে।

(২) ড়্গুধামন্দাঃ একবার খাওয়ার পর আর সারাদিন খেতে ইচ্ছে হবে না। মনে হবে পেট ভরে আছে। কোন কিছুতেই রম্নচি আসবে না।

(৩) জন্ডিসঃ জন্ডিস কখনো কখনো দেখা দেয়।

(৪) জ্বরঃ কখনো মারাত্মক জ্বর হয়। শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর আসে।

জটিলতাঃ

(১) পিত্তথলির পুজ যা এমপায়েমা নামে পরিচিত।

(২) পিত্তথলির ফুটা হয়ে যাওয়া।

(৩) পিত্তথলির গ্যাংগ্রিন।

(৪) ক্যান্সার

পরীড়্গাঃ নানাবিধ পরীড়্গা পদ্ধতি রোগ নির্ণয়কে সহজ করে ফেলেছে।

চিকিৎসাঃ চিকিৎসাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-মেডিসিন ও সার্জারী।

মেডিসিন চিকিৎসাঃ পিত্তপাথর রোগীরা প্রায়ই বলে থাকেন মেডিসিন দিয়ে পাথর বের করে দেন। আসলে মেডিসিনের কোন প্রকার ভূমিকা নেই পাথর সারাবার। তাই পাথর যেভাবে ধরা পড় ক না কেন অপারেশনই একমাত্র চিকিৎসা। আর সার্জারীই একমাত্র ভরসা। এক সময় প্রচলন ছিল পাথর নির্ণয় না হওয়ার কারণে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন করতো বছরের পর বছর। এখন যুগের পরিবর্তন হয়েছে নানাবিধ পরীড়্গা পদ্ধতি চালু হয়েছে তাই পাথর চিকিৎসা আর কোন সমস্যা নয়। বাজারে একটা ওষুধ চালু আছে যা দিয়ে পাথর গলিয়ে ফেলা যায় বলে সেই কোম্পানী দাবী করেছেন। আমি সেই কোম্পানির দাবীকে অযৌক্তিক মনে করছি না, তবে সেখানে যে শর্ত দেয়া হয়েছে ওষুধ প্রয়োগের ড়্গেত্রে তা পূরণ কঠিন। তাই মেডিসিন চিকিৎসার প্রতি নিয়োজিত থেকে অযথা সময় ড়্গেপণ করবেন না।

সার্জারী চিকিৎসাঃ- অনেক প্রকার পদ্ধতি এখন প্রচলিত। (১) ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতি (২) পেট কাটা পদ্ধতি। যদি পিত্তথলির জটিলতা না থাকে তবে ল্যাপারোস্কপিক পদ্ধতি সেরা। তবে তা হতে হবে বিশেষজ্ঞের হাতে। আজকাল যত্রতত্র এই পদ্ধতি চালু হয়েছে। অনভিজ্ঞ, আধা-অভিজ্ঞ সার্জন এই চিকিৎসার আয়োজন করছে। তাতে জটিলতা প্রচুর বাড়ছে। যথেষ্ট অভিজ্ঞ না হয়ে এই মেশিন কখনোই ব্যবহার করবেন না। আর যথেষ্ট অভিজ্ঞতা না হলে তার কাছে সার্জারী করাবেন না। তাতে কষ্ট বাড়বে, পয়সা খরচ বেশী হবে, জটিলতা বাড়বে। ইদানিং প্রায়ই শোনা যাচ্ছে রোগীদের বক্তব্য ল্যাপারোস্কপিক করলে আবার পেট কাটা লাগে। কথাটা যথেষ্ট সত্য। আমাদের দেশের পরীড়্গা পদ্ধতি ক্রটিপূর্ণ। আলট্রাসাউন্ড রির্পোট নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে। অভিজ্ঞ আলট্রাসাউন্ডদের হাতে সারা বিশ্বে সফলতার হার শতকরা ৭০ ভাগ। আমাদের দেশে এই হার আরো কম।

তাই প্রায়ই ভুল হয়। এই সেদিনও পিজি হাসপাতালে এক মহিলার আলট্রাসাউন্ড বিশ্বাস করে ল্যাপারোস্কপিক করতে যেয়ে ব্যর্থ হতে হলো। আলট্রাসাউন্ড বর্ণনার সাথে বাস্তôবতার কোন মিল নেই। সাথে সাথে পেট কাটা হলো এবং দেখা গেল পিত্তথলিতে তো পাথর আছে পাশাপাশি পিত্তনালীতেও পাথর আছে। যদি ঐ সময় পেট কাটা না হতো তাহলে এই রোগীও দ্বিতীয়বার সার্জারী লাগতো। তবে সঠিকভাবে শুধুমাত্র ল্যাপারোস্কপিক সার্জারী দ্বারা একমাত্র সার্জারী করা যাবে যদি রম্নটিনভাবে ইআরসিপি করে নেয়া যায়। এই প্রথা আমাদের দেশে আমি চালু করার পড়্গে অতিমাত্রায় সোচ্চার। এতে সময় বাঁচবে,পয়সা বাঁচবে রোগীদের দ্বিতীয়বার অপারেশনের ঝুঁকি থাকবে না। উন্নত বিশ্বের সব দেশে এই প্রথা চালু হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে তারা এই প্রথার পরীড়্গা ছাড়া ল্যাপারোস্কপিক করে না। ইআরসিপির আরো একটি ভাল দিক আছে। যেমন পেরিএমপুলারী ক্যান্সার শুরম্নতেই নির্ণয় করা যায়।

পিত্তথলিতে াজ জমে আছে, পিত্তথলির আয়তন বড় হচ্ছে, ডান পার্শ্বের হাতে চাকা লাগছে, সামান্য ব্যথা অনুভব হচ্ছে। ল্যাপারোস্কপিকের সাহায্যে অথবা পেট কেটে পিত্তপাথর অপারেশন করা হয়েছে রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ীতে গিয়েছে। ১-২ মাস পর পুনরায় জন্ডিস নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন। এবার পরীড়্গা করে ধরা পড়ল প্যানক্রিয়াসে ক্যান্সার। লিভার ও অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। কি নির্মম, অথচ ইআরসিপি করা হলে শুরম্নতেই ঐ রোগ ধরা পড়ত। আসল চিকিৎসা সম্ভব হতো। রোগীর অকাল মৃত্যু হতো না। সুতরাং সাবধান যত্রতত্র অপারেশন পরিত্যাগ করম্নন, বিশেষজ্ঞদের কাছে সঠিক উপদেশ নিন ও সঠিক চিকিৎসা করম্নন।

০ প্রফেসর ডাঃ মোঃ সহিদুর রহমান

বিভাগীয় প্রধান

হেপাটোবিলিয়ারী, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রান্সপস্নান্ট সার্জারী বিভাগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ,ঢাকা।

গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সার

ভূমিকাঃ সমগ্র পৃথিবীতে পাকস্থলীল ক্যান্সারে মৃত্যুর হার অধিক। সৌভাগ্যের বিষয় হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের মৃত্যুর হার কমতে শুরম্ন করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সমগ্র পৃথিবীতে প্রতি বছর ৬ লাখ ২৮ হাজার লোক গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে।

বিশ্বে গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের হার জাপানীদের ড়্গেত্রে অনেক বেশী। কোরিয়া, রাশিয়া, উত্তর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় এই রোগ দেখা যায়। তবে এটি এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি যা বিশ্বের সকল মানুষের মাঝে দেখা যায়। কোন কোন জাতির মধ্যে এই রোগ অধিক, কোন কোন জাতির মধ্যে এই রোগের হার খুবই কম।

রোগের কারণঃ

১· ধূমপানঃ ধূমপায়ীদের মাঝে এই রোগ দেখা যায়।

২· লবণঃ- খাদ্যে যারা প্রচুর লবণ গ্রহণ করে তারা ও এই রোগে আক্রান্তô হতে পারে।

৩· ফলমূল ও সবজি-যারা ফলমূল ও সবজি কম গ্রহণ করে থাকে তাদের মাঝে এই রোগ বেশী হয়।

৪· যারা প্রচুর মদ পান করে।

৫· যারা দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে।

৬· যাদের পাকস্থলীতে একবার অপারেশন করা হয়েছে।

৭·পাকস্থলীতে পলিপ থাকলে।

৮· পাকস্থলীতে ঘা থাকলে।

৯· প্রথম ডিগ্রী আত্মীয়-স্বজন যাদের ক্যান্সার হয়েছে। যেমন- বাবা, মা।

১০· হেলিকো ব্যকটোর পাইলোরী দিয়ে ইনফেকসন হলে।

রোগের লড়্গণঃ

এই রোগ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক ক্যান্সার ও এডভান্স ক্যান্সার। প্রাথমিক ক্যান্সার শতকরা ৮০ ভাগ লোকের কোন লড়্গণ থাকে না। এই অবস্থায় চিকিৎসার সফলতা অনেক বেশী। এডভান্স হলে নানান ধরনের রোগের লড়্গণ নিয়ে আবির্ভাব হয়। যথাঃ পেটে ব্যাথা, খাওয়ার অরম্নচি, বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া, অল্প আহারে মনে হবে পেট ভরে গেছে, রক্ত পায়খানা, রক্ত বমি, খাবার গিলতে কষ্ট হয়, শরীরের শক্তি কমতে থাকে, পায়ে পানি আসে, শরীর শুকাতে থাকে, লিভার ফুসফুস, হাড়, মগজ, কিডনি, চর্ম, হার্ট, থাইরয়েড, পেরিটানিয়াম আক্রান্তô হয়ে যায়। পায়ের শিরা আক্রান্তô হয়ে যায়।

পরীড়্গাঃ

নানাবিধ পরীড়্গা দ্বারা এই রোগ নির্ণয় করা যায়। এন্ডোসকপি, বায়োপসি, সিটিস্ক্যান, বেরিয়াম মিল এক্সরে, লিভার, এনজাইম। উদ্দেশ্য হল, শুরম্নতেই রোগ নির্ণয় করা ও চিকিৎসা দেয়া। যদি শুরম্নতেই রোগ নির্ণয় করা যায় তবে রোগীর আয়ু দীর্ঘায়িত হবে। এন্ডোসকপি, বায়োপসি এখন প্রায়ই মেডিকেল কলেজগুলোতে চালু হয়েছে যা রোগ নির্ণয়ের ড়্গেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক। গ্যাস্ট্রিক মনে করে দীর্ঘদিন ঔষধ খাচ্ছেন। নিজ ইচ্ছায় ঔষধের দোকানে গিয়ে ওমেপ্রাজম খাচ্ছেন আর তা কিছুটা হলেও উপসম করছে। এতে অধিকাংশ ড়্গেত্রে রোগ আলসার বা এসিটিটি থেকে ক্যান্সারে রূপ নিচ্ছে। তাই সন্দেহ হওয়া মাত্রই চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হবেন। চিকিৎসক প্রয়োজন বোধে আপনার এন্ডোসকপি করাবেন এবং দুশ্চিন্তôামুক্ত করাবেন।

চিকিৎসাঃ

নানা সফল চিকিৎসা শুরম্ন হয়েছে। তবে সার্জারী একমাত্র চিকিৎসা। এ ছাড়া রয়েছে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি। সার্জারীর সাহায্যে পাকস্থলীর আংশিক বা পূর্ণ অংশ কেটে ফেলা হয়। যার নাম র‌্যাডিক্যাল গ্রাস্ট্রেকটমী। এর সঙ্গে পাকস্থলীর পাশের অংশ যথা লিমফ গ্রন্থি, পেরিটোরিয়াম কেটে ফেলা হয়। এর দ্বারা র‌্যাডিক্যাল সার্জারী সম্ভব।

এরপর কেমোথেরাপি দিলে শরীরের যদি কোথাও ক্যান্সার কোষ থাকে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্যান্সারের বিস্তôৃতি নির্মূল হয়ে যায় মানুষের আয়ু বাড়ে।

আজকে একটি কেস নিয়ে আলোচন করব। নাম সৈয়দ আলী আসরাফ। বয়স ৬৮ বছর। বাসা ঢাকা কলাবাগানে। দেখলে মনে হবে বয়স্ককালে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে যথেষ্ট স্বাস্থ্যহানি ঘটেছে।

পেটে ব্যথা ও খাওয়ার প্রতি অরম্নচি দিয়েই অসুখের যাত্রা শুরম্ন। প্রথম প্রথম ভেবেছিলেন এ আর এমন কি? সামান্যতেই ভাল হয়ে যাবে। নিজে ঔষধের দোকানে যেয়ে গ্যাষ্ট্রিকের বড়ি খাওয়া শুরম্ন করলেন। ঔষধ প্রথম দিকে খেয়ে ৭-৮ দিন ভাল থাকতেন। এভাবে প্রায়ই তিন মাস চলল। গ্যাষ্ট্রিকের বড়ি খেলে এখন আর ধরে না। মনে বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে বমি হওয়া শুরম্ন হয়েছে। পেটের ব্যথাও বেশ বেড়েছে। একবার খেলে সারাদিন খেতে আর মন চায়না। সারাদিন পেট ভরা ভরা থাকে। শরীরের ওজন কমাতে শুরম্ন করেছে। পায়খানা কষা। কখনো কখনো ২/৩ দিন পরপর পায়খানা হয়। এই উপসর্গসমূহ নিয়ে ভারতে চলে গেলেন। নামকরা হাসপাতাল এপোলো। সেখানে গিয়ে হাজির । তারা সকল প্রকার পরীড়্গা-নিরীড়্গা শুরম্ন করলেন। এন্ডোসকপি করালেন। এন্ডোসকপি করে দেখলেন পাকস্থলীতে বিরাট আলসার, খাবারের প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বায়েতপসি নিলেন দেখলেন ক্যান্সার।

এরপরে সেখানে আর কোন চিকিৎসা করালেন না। ফিরে এলেন দেশে, আমার চেম্বারে। আমরা সিদ্ধান্তô নিলাম দ্রম্নত সার্জারী করতে হবে। পাকস্থলীর দুই তৃতীয়াংশ বাদ দিতে হবে। সাথে লিমফ অন্যান্য অঙ্গ পতঙ্গ ফেলতে হবে। ৪/৫ ঘন্টার সার্জারী। খুবই ঝঁকিপূর্ণ অপারেশন। তবে সঠিক ভাবে করতে পারলে রোগী রোগ মুক্ত হবে। আমরা সফল সার্জারী করলাআট দিনের মাথায় রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরেছে। ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে। এক সাইকেল কেমোথেরাপি দেয়ার সিদ্ধান্তô নেয়া হলো। জাপানে পাকস্থলীতে ক্যান্সারের হার খুবই বেশী। সেখানে তারা উন্নত পদ্ধতিতে সার্জারী করে। র‌্যাডিকেল সার্জারীই এদের মূল লড়্গ্য। এতে রোগী অনেক দিন বেঁচে থাকে। জাপানে প্রশিড়্গণ গ্রহণকালে তাদের আধুনিক পদ্ধতি রপ্ত করেছি। যা বিশ্বের সেরা পদ্ধতি হিসাবে খ্যাত।

প্রফেসর ডাঃ মোঃ সহিদুর রহমান

অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

বি·এস·এম·এম· ইউ।

লিভার, গ্যাষ্ট্রিক, জেনারেল হাসপাতাল ও রির্সাচ ইন্সস্টিটিউট।

বাড়ি নং-১০০/১, রোড নং-১১/এ, ধানমণ্ডি আ/এ, সাতমসজিদ রোড।

(ষ্টার কাবাবের বিপরীতে) ঢাকা-১২০